কাগজে-কলমে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল। কিন্তু বাস্তবে পুরোনো অবকাঠামো, চিকিৎসক সংকট, শয্যার অপ্রতুলতা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে চলছে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা। ফলে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা বিপুলসংখ্যক রোগীকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালটি গাইবান্ধা সদর উপজেলার একটি জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতাল।

সাম্প্রতিক সরেজমিন প্রতিবেদনগুলোতে দেখা গেছে, হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। অন্তর্বিভাগেও ধারণক্ষমতার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি থাকায় অনেককে মেঝে ও বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ওয়ার্ড ও শৌচাগারের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিয়েও রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ রয়েছে।

চিকিৎসক সংকটে ব্যাহত সেবা

হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও চিকিৎসাসেবার জনবল সেই অনুপাতে বাড়েনি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। হাসপাতাল সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ৪২টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২২ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের প্রায় অর্ধেকই শূন্য।

ফলে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসকদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে নার্স, সহায়ক কর্মী, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোগত সুবিধার ঘাটতি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে।

নতুন ভবন নির্মাণ হলেও পুরোপুরি চালু হয়নি

রোগীর চাপ কমাতে ২০১৮ সালে হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। গণপূর্ত বিভাগের তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির ব্যয় পরে বাড়িয়ে প্রায় ৩৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা করা হয়। ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হলেও দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হয়নি।

২০২৬ সালের জুলাইয়ের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও প্রায় ছয় বছর ধরে তা চালু হয়নি। এর ফলে পুরোনো অবকাঠামোর ওপরই রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ

হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার সংকটের পাশাপাশি কেনাকাটা ও দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারী কয়েকজন ঠিকাদারের দাবি, গত অর্থবছর এবং চলতি অর্থবছরের দরপত্রে এমন কিছু যোগ্যতার শর্ত রাখা হয়েছে, যা সাধারণ ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ সীমিত করতে পারে।

অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—দরপত্র প্রকাশের আগের নির্দিষ্ট সময় থেকে ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ থাকার শর্ত, একাধিক বছরের অডিট প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব শর্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবেশকে সংকুচিত করেছে।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে একই ধরনের অভিযোগের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দরপত্রে নোটিশ প্রকাশের আগেই নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে অর্থ থাকার শর্ত এবং মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে তিন বছরের অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়ার শর্ত নিয়ে ঠিকাদারদের আপত্তি রয়েছে।

অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, গত অর্থবছরে একাধিক শর্ত আরোপের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা সীমিত করা হয়েছিল এবং চলতি অর্থবছরেও একই ধরনের শর্ত রাখা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দরপত্র নথি, পিপিআর অনুযায়ী শর্ত এবং মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব ও বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের একটি আদেশে নিয়মিত তত্ত্বাবধায়ক পদায়ন না হওয়া পর্যন্ত ওএসডি কর্মকর্তা ডা. মো. শহিদুল্লাহকে গাইবান্ধা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

দরপত্রের শর্ত, ঠিকাদার নির্বাচন ও অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্য জানতে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক/আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, অভিযোগে ঘুষ লেনদেন ও নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার যে দাবি করা হয়েছে, তার পক্ষে এই প্রতিবেদনের হাতে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি বা আদালত/তদন্ত সংস্থার সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। তাই এসব অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

স্বচ্ছ তদন্তের দাবি

রোগীর চাপ, চিকিৎসক সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি সরকারি অর্থে পরিচালিত হাসপাতালের ক্রয় ও দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে দরপত্রের যোগ্যতার শর্তগুলো **পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (PPR)**-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছিল কি না এবং সর্বনিম্ন দরদাতা বা যোগ্য দরদাতাকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে কী কারণ দেখানো হয়েছে—এসব নথি যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও রোগীদের প্রত্যাশা, দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ, নতুন ভবনে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু এবং হাসপাতালের ক্রয় ও দরপত্র ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর মানুষের আস্থাও ফিরতে পারে।