সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলায় প্রায় দেড় কোটি টাকা রাজস্ব দিয়ে কালিজানা বিল ইজারা নেওয়ার পরও মাছ আহরণ করতে পারছেন না মৎস্যজীবীরা। জলমহালের ভেতরে থাকা খাস জলাশয় ইজারা দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। ইজারাদার মৎস্যজীবীদের অভিযোগ, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকার পরও এসব জলাশয় খাস ইজারায় দেওয়া হয়েছে এবং মাছ আহরণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে একই অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। সেখানে কালিজানা মৎস্যজীবী গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মো. বুলবুলও দাবি করেন, মাছ আহরণের মৌসুমে ছোট ছোট জলাশয় ইজারা দেওয়ায় তাদের ইজারা করা জলমহালে মাছ ধরতে সমস্যা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ১৪টি মৌজা নিয়ে গঠিত ২৮১ একরের বেশি আয়তনের কালিজানা জলমহালের পানি নামতে শুরু করেছে। জলমহালের ভাটির দিকে বাদশাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজসংলগ্ন কালিজানা নদীতে জাল দিয়ে মাছ আটকে আহরণের প্রস্তুতি নেন জলমহালের ইজারাদাররা। এ সময় জলমহালের ভেতরের জলাশয়ের ইজারাদাররা এতে বাধা দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
সরকারি একটি নথিতেও কালিজানা বিল গ্রুপ জলমহালের আয়তন **২৮১.৫৯ একর** এবং ইজারার বার্ষিক মূল্য হিসেবে প্রায় **৩৮ লাখ ৪৮ হাজার ৬৮১ টাকা** উল্লেখ রয়েছে।
তিন বছরে সরকারের রাজস্ব প্রায় দেড় কোটি টাকা
কালিজানা বিল গ্রুপ মৎস্যজীবী সমিতি জানায়, বার্ষিক ৩৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকা ইজারামূল্যে তিন বছরের জন্য জলমহালটি তাদের ইজারা দেওয়া হয়। দুই বছর উন্নয়নকাজের পর চলতি বছর তাদের মাছ আহরণের বছর। ইজারা, ভ্যাটসহ তিন বছরে সরকার প্রায় দেড় কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে বলে দাবি ইজারাদারদের।
ইজারাদারদের ভাষ্য, জলমহাল উন্নয়ন, পাহারা, বাঁশসহ অন্যান্য কাজে তারা আরও বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। এখন মাছ আহরণের সময় এসে ভাটির দিকে জাল ফেলতে না পারলে জলমহাল থেকে পানির সঙ্গে মাছ বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে দাবি তাদের।
আদালতের আদেশ অমান্যের অভিযোগ
ইজারাদারপক্ষের দাবি, জলমহালের অভ্যন্তরে থাকা সরকারি খাস জলাশয়গুলো খাস আদায়ের মাধ্যমে ইজারা না দেওয়ার জন্য তারা জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছিলেন। প্রতিকার না পেয়ে পরে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন।
তাদের দাবি, ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর হাইকোর্ট ছয় মাসের জন্য খাস আদায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। পরবর্তীতে ওই আদেশের মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানো হয় বলেও দাবি করেছেন তারা।
ইজারাদারদের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বদলির আগে গত জুলাইয়ে জলমহালের অভ্যন্তরের বিভিন্ন মৌজায় খাস আদায়ের মাধ্যমে জলাশয় ইজারা দেওয়া হয়। এরপর এসব জলাশয়ের ইজারাদাররা উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় কালিজানা বিলে মাছ আহরণে বাধা দিচ্ছেন বলে তাদের অভিযোগ।
তবে আদালতের আদেশের সুনির্দিষ্ট কপি ও পরবর্তী আদেশের মেয়াদ সংক্রান্ত নথি প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
‘আদালতের আদেশ জানার পর ইজারা বাতিল করা হয়েছে’
অভিযোগের বিষয়ে ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনি রায় বলেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) খাস জায়গার ভিত্তিতে ইজারা দিয়েছিলেন। আদালতের নির্দেশনার বিষয়টি জানার পর সেই ইজারা বাতিল করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জলমহালের ইজারাদাররা যদি খাস জায়গায় মাছ আহরণ করতে চান, তাহলে আদালতে গিয়ে তাদের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করিয়ে আনলে প্রশাসন আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল বলেন, আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে খাস আদায় করা হয়ে থাকলে তা আইনপরিপন্থী। জলমহালে মাছ আহরণ নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেন, আইন লঙ্ঘন করে খাস ইজারা দেওয়া হয়ে থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাড়ছে উত্তেজনা
মাছ আহরণ নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের কারণে কালিজানা জলমহাল এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত বিরোধের নিষ্পত্তি না হলে যেকোনো সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
মৎস্যজীবীদের দাবি, তারা সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব পরিশোধ করে বৈধভাবে জলমহাল ইজারা নিয়েছেন। তাই আদালতের আদেশ, ইজারার শর্ত এবং খাস জলাশয় ব্যবস্থাপনার আইনগত অবস্থান স্পষ্ট করে দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, আদালতের নির্দেশনা ও ইজারার বৈধতা যাচাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়াই এখন মূল বিষয়।