প্রতি অর্থবছর বাজেট ঘোষণার সময় সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে “দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত প্রায় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটও তার ব্যতিক্রম নয়। গত এক দশকে বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন—এই বৃদ্ধি কি রাষ্ট্রের বাস্তব সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিফলন, নাকি কেবল একটি পরিসংখ্যানগত সম্প্রসারণ?

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের আকার বড় হওয়া এবং রাষ্ট্রের সেবা প্রদানের সক্ষমতা বাড়া এক বিষয় নয়। বরং বাজেটের বাস্তবায়ন দক্ষতা, রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা এবং জনসেবায় তার প্রভাবই মূল বিচার্য।

২০১৫–১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাজেট ছিল প্রায় ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে—প্রায় ২.৬৮ গুণ বৃদ্ধি।

একই সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ শতাংশের আশেপাশে থাকলেও অতীতের উচ্চ প্রবৃদ্ধির তুলনায় তা কমে এসেছে বলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজেট বড় হলেও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত না হলে সেটি কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ফল দিতে পারে না।

গত এক দশকে মাথাপিছু আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সেবায় প্রতিফলিত হয়নি।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, মাথাপিছু আয় একটি গড় পরিসংখ্যান হলেও এটি আয় বৈষম্য ও সেবার প্রাপ্যতার বাস্তব চিত্র পুরোপুরি তুলে ধরে না।

আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সরকারি ব্যয়-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। ভারতে এটি তুলনামূলকভাবে বেশি এবং শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটানেও এই হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি ব্যয়-জিডিপি অনুপাত কম হলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় রাষ্ট্রের কার্যকর হস্তক্ষেপ সীমিত হয়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে সক্ষমতা বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রধান সীমাবদ্ধতা রাজস্ব আহরণ। কর-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলকভাবে কম এবং করদাতাদের একটি বড় অংশ নিয়মিতভাবে কর রিটার্ন জমা দেন না।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করজাল সংকীর্ণ থাকা, কর ফাঁকি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা রাজস্ব সক্ষমতাকে সীমিত করছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য সরকারের ওপর ঋণ ও ঘাটতি নির্ভরতা বাড়ছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অর্থ পুরোপুরি ব্যয় না হওয়া এবং বাস্তবায়নের ধীরগতিকে প্রশাসনিক অদক্ষতার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও সময়মতো অর্থ ব্যয় না হলে উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি কমে যায় এবং প্রকল্পের সুফল দেরিতে আসে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের সরকারি ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানবসম্পদ উন্নয়নে এই দুই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বাজেটের আকার বৃদ্ধি উন্নয়নের একটি সূচক হলেও তা একমাত্র মানদণ্ড নয়। বরং রাজস্ব আহরণ, ব্যয় দক্ষতা, সুশাসন এবং জনসেবার মানই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রকৃত মাপকাঠি।

একজন সাবেক অর্থনীতিবিদ বলেন, উন্নয়নের প্রকৃত পরিমাপ বাজেটের আকারে নয়; বরং সেই অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে সংগ্রহ, ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে—তার ওপর নির্ভর করে।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত, বাজেট বড় হলেও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের দক্ষ বাস্তবায়ন।