দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালী মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু হয়েছে। তবে ৫৬৯ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ শুরুর পরই পুরোনো দুই লেনের সড়কে খানাখন্দ, ধুলাবালি ও জলাবদ্ধতার কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রী, চালক, পথচারী ও সড়কের দুই পাশের বাসিন্দারা। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির লাইনসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি সরানো নিয়ে দেখা দিয়েছে সমন্বয় জটিলতা।
নোয়াখালীর চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর বাস টার্মিনাল পর্যন্ত প্রায় ২৯ কিলোমিটার মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। সড়কটির নতুন প্রস্থ হবে ২০ মিটার। প্রকল্পটি পাঁচটি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে লক্ষ্মীপুর অংশের প্রায় ১৮ কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২৯ কোটি টাকা এবং নোয়াখালী অংশের প্রায় ১১ কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকল্পের কাজ চলতি বছরের জানুয়ারিতে শুরু এবং ২০২৯ সালে শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
খানাখন্দে দুর্ভোগ
সরেজমিনে দেখা গেছে, মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। বৃষ্টির সময় এসব গর্তে পানি জমে থাকছে। আবার বৃষ্টি থামার পর শুকনো সড়ক থেকে উড়ছে ধুলাবালি। জকসিন, মান্দারী, জেলা কারাগার এলাকা ও লক্ষ্মীপুর শহরের বাগবাড়ীসহ কয়েকটি স্থানে সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে।
চালকদের অভিযোগ, গর্ত এড়িয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে সময় বেশি লাগছে। পাশাপাশি সড়কের বেহাল অবস্থায় যানবাহনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। বৃষ্টির সময় পানির নিচে গর্তের গভীরতা বোঝা না যাওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
সড়কের পাশের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন ভোগান্তিতে। ধুলাবালিতে ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নোংরা হচ্ছে। নিয়মিত এই সড়ক ব্যবহারকারী শিক্ষার্থী ও পথচারীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নির্মাণকাজের সময় ধুলা নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত পানি ছিটানো হচ্ছে কি না, তা নিয়েও স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে।
ইউটিলিটি সরানো নিয়ে জটিলতা
নির্মাণকাজের বিভিন্ন অংশে মাটি কাটা ও নির্মাণসামগ্রী রাখার কাজ চললেও কোথাও কোথাও সড়কের জায়গায় এখনো বৈদ্যুতিক খুঁটি রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে গ্যাস ও পানির লাইন এবং অন্যান্য স্থাপনাও নির্মাণকাজে বাধা তৈরি করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের ভাষ্য, প্রকল্প এলাকার পুরো জায়গা বুঝে না পাওয়ায় নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেওয়া কঠিন হচ্ছে। অন্যদিকে, সড়ক বিভাগের দাবি, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে জায়গা পরিষ্কারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়া হলেও কিছু স্থানে কাজের উপযোগী পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির লক্ষ্মীপুরের ব্যবস্থাপক অতুল কুমার নাগ জানিয়েছেন, গ্যাস পাইপলাইন স্থানান্তরের বিষয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে দ্রুত কাজ শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সড়ক উপ-বিভাগ, লক্ষ্মীপুরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোশাররফ হোসেন বলেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে জায়গা পরিষ্কারের জন্য প্রাক্কলিত অর্থ ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। এরপরও জায়গা পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়ায় কিছু স্থানে নির্মাণকাজে বাধা তৈরি হচ্ছে।
পুরোনো সড়কেই চাপ
চার লেনের নির্মাণকাজের পাশাপাশি পুরোনো দুই লেনের সড়ক দিয়েই বর্তমানে যানবাহন চলাচল করছে। ফলে গর্ত, পানি ও ধুলাবালির কারণে সড়কটির ওপর চাপ বাড়ছে। সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে একই পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে।
লক্ষ্মীপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. আহসান হাবীব নির্মাণকাজ থেকে সৃষ্ট ধুলাবালির কারণে জনস্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
সমন্বয়েই নির্ভর করছে সুফল
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর মধ্যে সড়ক যোগাযোগ আরও উন্নত হবে। তবে নির্মাণকাজ নির্বিঘ্নে এগিয়ে নিতে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও অন্যান্য ইউটিলিটি সংস্থার সঙ্গে সড়ক বিভাগের কার্যকর সমন্বয় জরুরি।
একই সঙ্গে নির্মাণকালীন সময়ে পুরোনো সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা, গর্ত মেরামত, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নিয়মিত ধুলা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের প্রত্যাশা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পাশাপাশি নির্মাণকালীন দুর্ভোগও সহনীয় পর্যায়ে রাখা হবে।
