ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন তিনটি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিতাস-৩১ কূপটি ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতায় খনন করা হচ্ছে, যা দেশের সবচেয়ে গভীর অনুসন্ধান কূপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কূপটি সফল হলে দৈনিক প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে বলে কর্মকর্তারা আশা করছেন।
বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) বলছে, তিতাসের ২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপের কাজ শেষ হলে এসব কূপ থেকে সম্মিলিতভাবে দৈনিক প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, কারিগরি জটিলতা বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি না করলে আগামী ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যে তিন কূপের কাজ শেষ করা সম্ভব হতে পারে।
তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের নন্দনপুর এলাকায় তিতাস-৩১ কূপের খনন শুরু হয় ২০২৬ সালের ১৯ এপ্রিল। কূপটির পরিকল্পিত গভীরতা ৫ হাজার ৬০০ মিটার। কর্মকর্তাদের মতে, প্রচলিতভাবে তিতাসে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মিটার পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। নতুন কূপের মাধ্যমে এর নিচের স্তরগুলোতে গ্যাসের উপস্থিতি যাচাই করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতার মধ্যে কয়েকটি সম্ভাবনাময় স্তর চিহ্নিত হয়েছে। ভূতাত্ত্বিক ও ভূকম্পন জরিপের ভিত্তিতে ওই গভীর স্তরে উল্লেখযোগ্য গ্যাস মজুদের সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রকৃত মজুদ ও বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ কূপের খনন ও পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তিতাস-৩১ কূপটি উচ্চচাপ ও উচ্চতাপমাত্রার বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে খনন করতে হচ্ছে। ফলে গভীরতার কারণে খননকাজে কারিগরি জটিলতার ঝুঁকিও রয়েছে। এ কারণে কূপটি থেকে গ্যাস পাওয়ার পূর্বাভাসকে এখনই নিশ্চিত উৎপাদন হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিজিএফসিএলের গভীর অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব বলেন, তিনটি কূপ সফলভাবে খনন করা গেলে গড়ে দৈনিক ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিতাস-২৯ কূপের কাজ শেষ হওয়ার পর একই রিগ ব্যবহার করে তিতাস-৩০ কূপের খনন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, তিতাস-২৯ কূপের খননকাজ তুলনামূলক কম গভীর হওয়ায় বড় ধরনের কারিগরি সমস্যা না হলে দ্রুত শেষ করা সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীর তিতাস-৩১ কূপে কাজ শেষ করতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, তিতাস-৩১ ও বাখরাবাদ-১১ গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের জন্য বিজিএফসিএল একটি পৃথক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তিতাস-৩১ কূপের নির্ধারিত গভীরতা ৫ হাজার ৬০০ মিটার এবং বাখরাবাদ-১১ কূপের প্রায় ৪ হাজার ৩০০–৪ হাজার ৩৬০ মিটার। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে।
তিতাসের উৎপাদন বাড়াতে গভীর অনুসন্ধানের পাশাপাশি উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রমও চলছে। বিজিএফসিএলের তথ্য অনুযায়ী, পুরোনো কয়েকটি কূপে ওয়েলহেড কমপ্রেসর স্থাপনের পর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ২২ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হয়েছে।
বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুল জলিল প্রামাণিক বলেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নতুন কূপগুলো থেকে উৎপাদন জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তাঁর মতে, দেশীয় উৎস থেকে অতিরিক্ত গ্যাস পাওয়া গেলে আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
তবে নতুন কূপ থেকে প্রত্যাশিত গ্যাস পাওয়া যাবে কি না এবং কত পরিমাণে পাওয়া যাবে—তা খনন, লগিং ও পরীক্ষামূলক উৎপাদন শেষে নিশ্চিত হবে। ফলে ৪০–৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের হিসাবটি বর্তমানে বিজিএফসিএলের প্রত্যাশিত উৎপাদন, নিশ্চিত মজুদ বা নিশ্চিত সরবরাহ নয়।
তিতাস গ্যাসক্ষেত্র দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র। পুরোনো কূপগুলোর চাপ ও উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে নতুন কূপ খনন, গভীর অনুসন্ধান ও ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে বিজিএফসিএল।
