ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই শেষ হবে বলে দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, যুদ্ধ শেষ হলে তেলের দামও দ্রুত কমে আসবে।

বুধবার টেক্সাসের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, “যুদ্ধ নির্বাচনের পরপরই শেষ হবে”। তাঁর দাবি, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে এবং অর্থনৈতিক চাপের মুখে তেহরান আর বেশি দিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে না।

Advertisement

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের অর্থ হলো, অন্তত তাঁর বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সংঘাতের অবসান হওয়ার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। তবে তিনি কোনো নির্দিষ্ট শান্তিচুক্তি, যুদ্ধবিরতি বা কূটনৈতিক সমঝোতার সময়সূচি ঘোষণা করেননি। বরং তিনি স্বীকার করেছেন, আলোচনা হতে পারে, যদিও তাঁর প্রশাসন বর্তমানে নতুন করে আলোচনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না।

যুদ্ধের মধ্যেই তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়াল

ট্রাম্পের মন্তব্যের দিনই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। ব্রেন্ট crude-এর দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়—জুলাইয়ের পর প্রথমবারের মতো। যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক WTI-ও প্রায় ৯৬ ডলারে পৌঁছে যায়।

তেলের বাজারে এই ঊর্ধ্বগতির অন্যতম প্রধান কারণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ-ঝুঁকি। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। The Guardian জানিয়েছে, হরমুজের আশপাশে সাম্প্রতিক হামলায় ইরান ১০টি জাহাজ লক্ষ্য করার দাবি করেছে; তবে মার্কিন বাহিনী তাদের কোনো জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার কথা অস্বীকার করেছে।

AP-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। এমনকি বড় ধরনের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে দাম ১৫০ ডলার পর্যন্ত ওঠার ঝুঁকির কথাও বাজার বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন। তবে এগুলো সম্ভাব্য পরিস্থিতি—নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।

নির্বাচনের সঙ্গে তেলের বাজারকে যুক্ত করলেন ট্রাম্প

ট্রাম্প সরাসরি তেলের দামের গতিপথকেও নভেম্বরের নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর ভাষ্য, নির্বাচন শেষ হওয়ার পর তেলের দাম **“নিচের দিকে দ্রুত নামবে”**।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য বলছে, তেলের দাম কেবল রাজনৈতিক সময়সূচির ওপর নির্ভর করে না। যুদ্ধের তীব্রতা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল, উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক চাহিদা—সবকিছু মিলেই দাম নির্ধারিত হয়।

এ কারণে ট্রাম্পের নির্বাচনের পর তেলের দাম কমার পূর্বাভাসকে **বাজারের নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন না আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা**। বরং AP জানিয়েছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে উচ্চ জ্বালানি মূল্য বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ

ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। তবে বর্তমানে তাঁর প্রশাসন নতুন করে আলোচনা শুরু করার দিকে এগোচ্ছে না। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ওয়াশিংটনের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।

অন্যদিকে *Financial Times* জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আগের সমঝোতায় ফেরার চেষ্টা থাকলেও একটি বৃহত্তর চুক্তির বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, *The Wall Street Journal*-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে আশঙ্কা করছেন যে যুদ্ধ তাঁর প্রকাশ্য পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে চলতে পারে। অর্থাৎ **নভেম্বরের পরপরই যুদ্ধ শেষ হবে—এটি এখনো নিশ্চিত কোনো সময়সীমা নয়, বরং ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও কৌশলগত পূর্বাভাস।**

রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে ওয়াশিংটনে

নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ততই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। AP জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিন ও ডিজেলের দাম বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগও বাড়ছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে ট্রাম্পের অনুমোদন হারও সাম্প্রতিক সময়ে রেকর্ড নিম্নস্তরে নেমেছে। ফলে নভেম্বরের নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে না, ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও এক ধরনের গণভোটে পরিণত হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের বক্তব্যের সবচেয়ে নির্ভুল সারমর্ম হলো—**তিনি মনে করছেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে শেষ হবে না এবং নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই সংঘাত থামবে ও তেলের দাম কমবে।** কিন্তু যুদ্ধের বর্তমান সামরিক পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা এবং ওয়াশিংটনের ভেতরের ভিন্ন মূল্যায়নের কারণে তাঁর এই পূর্বাভাস এখনো নিশ্চিত নয়।