চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশের বিভিন্ন থানায় ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি ২ হাজার ৩৮ জনের।
পুলিশ সদর দপ্তরের ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজের জিডি হওয়া শিশুদের প্রায় ৮৭ শতাংশেরই সন্ধান পাওয়া গেছে। ফলে সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে—এটি বলার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন; কারণ সংখ্যাটি মূলত নিখোঁজ-সংক্রান্ত জিডির হিসাব, স্থায়ীভাবে নিখোঁজ থাকা শিশুর সংখ্যা নয়।
বয়সভেদে নিখোঁজের চিত্র
পুলিশের যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, শিশু নিখোঁজের ক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক চিত্রে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
বয়স নিখোঁজের জিডি উদ্ধার/ফিরে এসেছে এখনো নিখোঁজ
০–৯ বছর ৪৭৪ ৪০৬ ৬৮
১০–১৭ বছর ১৫,২৪৩ ১৩,২৭৩ ১,৯৭০
মোট ১৫,৭১৭ ১৩,৬৭৯ ২,০৩৮
অর্থাৎ, মোট নিখোঁজের জিডির প্রায় ৯৭ শতাংশই ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের নিয়ে। বিপরীতে শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে জিডি হয়েছে ৪৭৪টি, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ।
১০–১৭ বছর বয়সীদের ঝুঁকি বেশি
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১৫ হাজার ২৪৩ শিশুর নিখোঁজের জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি ১ হাজার ৯৭০ জনের।
এই বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ৮৭ দশমিক ১ শতাংশের সন্ধান পাওয়া গেছে। অন্যদিকে প্রায় ১২ দশমিক ৯ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় প্রতি আটজনের একজনের এখনো সন্ধান মেলেনি।
০–৯ বছর বয়সী ৪৭৪ শিশু
শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে সাত মাসে নিখোঁজের জিডি হয়েছে ৪৭৪টি। এর মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, আর এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি ৬৮ জনের।
এই বয়সী শিশুদের প্রায় ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশের সন্ধান পাওয়া গেছে। অপরদিকে প্রায় ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ এখনো নিখোঁজ রয়েছে।
পুলিশের যাচাই অনুযায়ী, এ বয়সী শিশুরা অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলে। আবার কেউ কেউ পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারায় কিংবা একা বাড়ি ফেরার সময় অন্যত্র চলে যাওয়ায় নিখোঁজ হিসেবে জিডিভুক্ত হয়।
সাত মাসে প্রতিদিন গড়ে ৭৩টি নিখোঁজের জিডি
জানুয়ারি থেকে জুলাই—এই ২১২ দিনে ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডির হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৪টি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা থানায় নথিভুক্ত হয়েছে।
তবে এই হিসাবকে প্রতিদিন ৭৪ শিশু স্থায়ীভাবে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে—এভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। কারণ একই সময়ের মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুর সন্ধান পাওয়া গেছে। পুলিশও জানিয়েছে, নিখোঁজের পর কতজন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে—এসব তথ্য বাদ দিয়ে শুধু নিখোঁজের সংখ্যা প্রকাশ করলে প্রকৃত চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আগের বছরগুলোর তুলনায় কী বলছে পরিসংখ্যান
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৭ হাজার ৮০৮টি, ২০২৪ সালে ১৬ হাজার ৪১৪টি এবং ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০টি জিডি হয়েছিল। তিন বছরে মোট জিডির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৬ হাজার ৭৭২টি।
২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডি হওয়ায় বছর শেষে সংখ্যা কোথায় দাঁড়াবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে সাত মাসের সংখ্যা দিয়ে পুরো বছরের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন।
কেন ১০–১৭ বছর বয়সীদের সংখ্যা এত বেশি?
পুলিশের প্রকাশিত ব্যাখ্যায়, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে পারিবারিক অশান্তি, অভিমান, পড়াশোনার চাপ, স্বাধীনভাবে চলাফেরার আকাঙ্ক্ষা এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবের মতো বিষয় থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনাকে একই কারণে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তার অবস্থান, পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি আলাদাভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন সন্ধান না পাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে পাচার, অপরাধচক্র বা অন্য কোনো অপরাধের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান না পাওয়া বড় উদ্বেগ
সাত মাসে নিখোঁজের জিডি হওয়া ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনের সন্ধান পাওয়া গেলেও ২ হাজার ৩৮ শিশুর এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি। এই সংখ্যা মোট নিখোঁজের প্রায় ১৩ শতাংশ।
বয়সভিত্তিক হিসাবে এদের মধ্যে ৬৮ জনের বয়স ০–৯ বছর এবং ১ হাজার ৯৭০ জনের বয়স ১০–১৭ বছর। অর্থাৎ এখনো নিখোঁজ থাকা শিশুদের প্রায় ৯৭ শতাংশই ১০–১৭ বছর বয়সী।
এ পরিসংখ্যান শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্বেগের কারণ। কারণ ১০–১৭ বছর বয়সী শিশুরা তুলনামূলকভাবে চলাফেরায় স্বাধীন হলেও তারা নানা ধরনের সামাজিক, পারিবারিক ও অনলাইন ঝুঁকির মুখে থাকে।
নিখোঁজের সংখ্যা নয়, ফিরে না আসাদের দিকেও নজর জরুরি
শিশু নিখোঁজের পরিসংখ্যান প্রকাশের ক্ষেত্রে শুধু মোট জিডির সংখ্যা সামনে আনলে মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া শিশুদের সংখ্যা দেখিয়ে বিষয়টির গুরুত্ব কমিয়ে দেখাও ঠিক নয়।
কারণ, ২ হাজার ৩৮ শিশুর এখনো সন্ধান না পাওয়া একটি গুরুতর মানবিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত উদ্বেগ। নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত জিডি গ্রহণ, তথ্য যাচাই, প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান এবং পরিবারের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ১০–১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের নিখোঁজ হওয়ার উচ্চ হার কেন তৈরি হচ্ছে, তার কারণ নিয়ে আলাদা গবেষণা ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং শিশু সুরক্ষায় কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলেই ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।