মুঠোফোনে কার সঙ্গে কথা বলেছেন, কখন কথা বলেছেন কিংবা কোন এলাকায় অবস্থান করেছেন—এ ধরনের ব্যক্তিগত তথ্যও এখন অর্থের বিনিময়ে সংগ্রহ করা সম্ভব বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। শুধু সাধারণ নাগরিক নন, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও টেলিযোগাযোগ-তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মুঠোফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) পর্যন্ত অনলাইনে অর্থের বিনিময়ে পাওয়া যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে একটি মন্ত্রীর মুঠোফোন নম্বর দিয়ে অর্থ পরিশোধের পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর তিন মাসের সিডিআর সংগ্রহ করা হয়। পরে মন্ত্রীর সঙ্গে তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখা হলে তিনি সিডিআরের তথ্য সঠিক বলে নিশ্চিত করেন। ঘটনাটি ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় তথ্যব্যবস্থার সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, সিডিআরের পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জন্মনিবন্ধন, মুঠোফোনের অবস্থান, কললিস্ট, পাসপোর্টের তথ্য, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), এমনকি মোবাইল আর্থিক সেবার লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য বিক্রির জন্য বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে।

তথ্য যাচাই ও অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইট এবং ফেসবুকে ৬০০টির বেশি ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির পোস্ট শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে।

তিন মাসের সিডিআর ১ হাজার ৫০ টাকা

অনুসন্ধানে পাওয়া একটি ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে দেখা যায়, সেখানে এনআইডি, স্মার্ট এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, বায়োমেট্রিক তথ্য, লোকেশন, কললিস্ট, পাসপোর্টের কপি ও মোবাইল আর্থিক সেবার তথ্যসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহের বিজ্ঞাপন রয়েছে।

ওই সাইটে তিন মাসের সিডিআরের জন্য ১ হাজার ৫০ টাকা এবং ছয় মাসের জন্য ১ হাজার ২০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও তথ্য সরবরাহের জন্য হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যম ব্যবহারের কথাও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানেও ব্যক্তিগত তথ্যের এই অনলাইন বাজারের দ্রুততা নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির অনুসন্ধান অনুযায়ী, ৫০০ টাকা দেওয়ার পর ১৭ মিনিটের মধ্যে একটি এনআইডির তথ্য সরবরাহের ঘটনা ঘটেছে। একইভাবে তিন মাসের সিডিআরের জন্য ১ হাজার ৫০ টাকা পরিশোধের পর অল্প সময়ের মধ্যে তথ্য পাওয়ার ঘটনাও নথিবদ্ধ করা হয়েছে।

বিটিআরসি: বিষয়টি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেছেন, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে বিক্রি হলে তা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার কথা জানিয়েছেন তিনি।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামও বলেছেন, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে বিক্রি বা ফাঁস হতে দেওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে সরকার কাজ করছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

কী থাকে সিডিআরে

একজন গ্রাহক কাকে ফোন করেছেন, কে তাঁকে ফোন করেছেন, কলের সময় ও স্থায়িত্বসহ বিভিন্ন তথ্য মোবাইল অপারেটরদের সংরক্ষণ করতে হয়। সিডিআরে সাধারণত কল-সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংযোগ ও ব্যবহৃত নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর তথ্যও থাকতে পারে।

তবে সিডিআরকে মুঠোফোনের সব ধরনের ব্যক্তিগত যোগাযোগের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল বা টেলিগ্রামের মতো ইন্টারনেটভিত্তিক অ্যাপের বার্তার বিষয়বস্তু সাধারণ সিডিআরে থাকে না।

বিটিআরসির নথিতেও দেখা যায়, জাতীয় নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সিডিআর ও লোকেশনভিত্তিক তথ্য সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে।

দায় কোথায়

ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—এই তথ্যগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং কারা অননুমোদিতভাবে তা ব্যবহার বা বিক্রি করছে।

একটি মোবাইল অপারেটরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, কিছু সরকারি সংস্থার নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা অপারেটরের অনুমোদিত প্রক্রিয়ার বাইরে তথ্যভান্ডারে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন। তবে এই দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে গ্রামীণফোন ও রবি লিখিত জবাবে তথ্যভান্ডারে প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আইন ও অনুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসারেই নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

ফলে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের প্রকৃত উৎস শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত নিরীক্ষা, প্রবেশাধিকার ব্যবস্থার তদন্ত এবং তথ্য ব্যবহারের লগ পর্যালোচনা জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

আগেও তথ্য ফাঁস নিয়ে উদ্বেগ

বাংলাদেশে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঘটনা নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডার থেকে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের অভিযোগ সামনে এসেছে।

ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে বিক্রির যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়—বরং তথ্য সংগ্রহ, ক্রেতা খোঁজা, অর্থ লেনদেন এবং তথ্য সরবরাহকে ঘিরে একটি সংগঠিত অনলাইন বাজার গড়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

তথ্যপ্রযুক্তি ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাগরিকের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য অর্থের বিনিময়ে সহজলভ্য হয়ে গেলে তা শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারই ক্ষুণ্ন করে না; অপরাধী চক্রের হাতেও তা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্টরা বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, তথ্য ফাঁসের উৎস শনাক্তকরণ এবং তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা দ্রুত সংশোধনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

ব্যক্তিগত তথ্যকে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে কেনাবেচার এই প্রবণতা বন্ধ করতে শুধু অনলাইন বিজ্ঞাপন সরিয়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়। তথ্য কোথা থেকে বের হচ্ছে, কারা প্রবেশাধিকার পাচ্ছে এবং ফাঁসের ঘটনায় কার দায় রয়েছে—এসব প্রশ্নের জবাব বের করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব যেসব প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।