শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে অটোরিকশাচালকের বাড়িতে চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধ এখন থানায় গড়িয়েছে। চুরির ঘটনায় এক যুবকের দেওয়া পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে একাধিক ব্যক্তির নাম আসা এবং এক স্যানিটারি মিস্ত্রির ওপর চুরি যাওয়া টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগের অভিযোগ ঘিরে এলাকায় তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
গত ৭ জুলাই উপজেলার নন্নী ইউনিয়নের কয়রাকুড়ি গ্রামের অটোরিকশাচালক খলিলুর রহমানের বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পাশের ভটপুর গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার পর রাতে বাড়ি ফিরে তিনি দেখতে পান, ঘরের প্লাস্টিকের ওয়ারড্রোবের ড্রয়ারের তালা খোলা। তাঁর দাবি, ড্রয়ারে রাখা নগদ ২০ হাজার টাকা ও প্রায় আট আনা স্বর্ণালঙ্কার সেখানে পাওয়া যায়নি।
চুরির বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে স্থানীয়ভাবে খোঁজখবর শুরু হয়। এ সময় একই গ্রামের চাঁন মিয়ার ছেলে সোহান (১৯) চুরির সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে স্থানীয় কয়েকজনের দাবি। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চুরি যাওয়া টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারের সন্ধান চালানো হলেও সেগুলোর হদিস পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
পরে সোহানের বক্তব্যে রাকিব নামে এক যুবকের নাম আসে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এরপর সোহানের বক্তব্যে একই এলাকার স্যানিটারি মিস্ত্রি মুক্তার হোসেনের নাম আসে। মুক্তারের অভিযোগ, তাঁকে চুরির ঘটনায় জড়িত দেখিয়ে চুরি যাওয়া টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য স্থানীয় একটি পক্ষ চাপ দিচ্ছে।
মুক্তার হোসেন দাবি করেন, চুরির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি বলেন, আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হওয়ায় একটি পক্ষ তাঁকে চুরির ঘটনায় ফাঁসিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকা আদায়ের চেষ্টা করছে। তাঁর অভিযোগ, সোহানকে দায়মুক্ত করার উদ্দেশ্যেই পরবর্তী সময়ে তাঁর নাম সামনে আনা হয়েছে।
তবে খলিলুর রহমানের ভাষ্য ভিন্ন। তিনি বলেন, চুরির পর প্রথমদিকে তিনি কাউকে সন্দেহ করেননি এবং থানায়ও অভিযোগ করেননি। পরে সোহানের পরিবারের মাধ্যমে চুরির বিষয়টি সামনে আসে। তাঁর দাবি, সোহান প্রথমে নিজেকে ঘটনায় জড়িত থাকার কথা বললেও পরে রাকিব ও মুক্তারের নাম উল্লেখ করে।
এদিকে ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের বিরোধও তীব্র হয়েছে। গত ২৩ আগস্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে খলিলুর রহমানের বাড়িতে মুক্তারের মা রহিমা বেগম ও খালা ফরিদা বেগমকে বেঁধে রাখার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় মুক্তারের বাবা মোহাব্বত আলী খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে নালিতাবাড়ী থানায় অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে খলিলুর রহমানও মুক্তার হোসেন ও সোহানের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। ফলে একটি বাড়িতে চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, মুক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে এর আগে চুরির কোনো অভিযোগ তাঁদের জানা নেই। একই সঙ্গে সোহানের বক্তব্যে একের পর এক নাম পরিবর্তিত হওয়ায় প্রকৃত ঘটনা নিয়েও তাঁদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মুক্তারপক্ষের আরও অভিযোগ, স্থানীয় একটি পক্ষ সোহানকে প্রভাবিত করে মুক্তারের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়াচ্ছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ফলে চুরির ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে কারা জড়িত, সোহানের বক্তব্য কতটা নির্ভরযোগ্য এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে চুরির দায় চাপিয়ে ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
নালিতাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুজ্জামান বলেন, এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চুরির ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের তদন্তই এখন গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সোহানের বক্তব্যের সত্যতা, চুরি যাওয়া টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারের অবস্থান এবং দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসতে পারে।