টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে কক্সবাজার জেলায় জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানির পাশাপাশি হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে উদ্ধার ও সতর্কতামূলক কার্যক্রম জোরদার করেছে।

জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, টানা বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকায় বসতবাড়ি, সড়ক ও কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।

এদিকে, টানা বর্ষণের মধ্যে জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। সর্বশেষ চকরিয়া উপজেলার বরইতলী এলাকায় পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। এর আগে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে আরও কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে মোট প্রাণহানির সংখ্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও ভারী বর্ষণে একাধিক স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রশাসন ও মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলো।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। গত কয়েক দিনে জেলায় অস্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে এবং আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এ কারণে পাহাড়ধস ও আকস্মিক জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক দল কাজ করছে। অনেক এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তবে কিছু বাসিন্দা ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে অনীহা প্রকাশ করায় তাদের বোঝানোর পাশাপাশি প্রয়োজন হলে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

ভারী বর্ষণে কুতুবদিয়া উপজেলার একটি সংযোগ সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয় যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটেছে। বিভিন্ন এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট, খাদ্যসংকট, স্যানিটেশন সমস্যা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন।

বৈরী আবহাওয়ার কারণে কক্সবাজার উপকূলে মাছ ধরার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। অধিকাংশ মাছ ধরার ট্রলার নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে। সমুদ্র উত্তাল থাকায় ছোট নৌযান চলাচলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি কিছু নৌপথে যোগাযোগও সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি পাহাড় কাটা, প্রাকৃতিক জলাধার ও খাল ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কক্সবাজারে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। তাদের মতে, পাহাড় সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলেন, বৈরী আবহাওয়ার পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সম্ভাব্য যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং জরুরি সহায়তার জন্য কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।