বাল্যবিবাহ সংঘটিত হওয়ার পর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে ঝুঁকিতে থাকা কিশোরীকে আগেই শনাক্ত করে পরিবার, বিদ্যালয় ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কক্সবাজারের শিক্ষা কর্মকর্তারা ও শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা।

তাঁরা বলেছেন, বাল্যবিবাহের পেছনে দারিদ্র্য, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, শিশুশ্রম, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, কুসংস্কার, লিঙ্গবৈষম্য, দুর্যোগ ও বাস্তুচ্যুতির মতো বিভিন্ন কারণ কাজ করে। এসব ঝুঁকি আগেভাগে চিহ্নিত করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব।

বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধ এবং বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমমুক্ত কক্সবাজার গড়ার লক্ষ্যে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে হোটেল বিচ ওয়ের সম্মেলন কক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের আয়োজনে এবং ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের চাইল্ড সেফটি নেট প্রকল্পের সহযোগিতায় আয়োজিত সভায় জেলার বিভিন্ন উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা অংশ নেন। সভাটির আয়োজন ও অংশগ্রহণের তথ্য সমসাময়িক একটি প্রকাশিত প্রতিবেদনেও মিলে গেছে।

সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন কক্সবাজারের জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গুলশান আকতার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের মবিলাইজেশন অ্যান্ড সিস্টেম স্ট্রেংদেনিং অফিসার লুইজা মন্ডল।

সভায় স্বাগত বক্তব্যের পাশাপাশি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ বিষয়ে প্রেজেন্টেশন ও ভিডিও উপস্থাপন করেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের চাইল্ড সেফটি নেট প্রকল্প ব্যবস্থাপক সাগর ডি কস্তা। তিনি শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

সাগর ডি কস্তা বলেন, কোনো ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর নিয়মিত উপস্থিতি, দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা, আচরণগত পরিবর্তন এবং পারিবারিক আর্থিক সংকটকে সম্ভাব্য ঝুঁকির সূচক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কোনো কিশোরী বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার আগেই তাকে শনাক্ত করে পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রধান অতিথি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বলেন, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বিষয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে বিষয়টি উপেক্ষা না করে দ্রুত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

তিনি বলেন, শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্নতা যেন বাল্যবিবাহ কিংবা শিশুশ্রমের পথ তৈরি না করে, সে বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ সম্ভব নয়; পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ ও প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গুলশান আকতার বলেন, শিশু সুরক্ষায় শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশুর পড়াশোনায় অনাগ্রহ, নিয়মিত অনুপস্থিতি কিংবা আচরণগত পরিবর্তন অনেক সময় পারিবারিক বা সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত দিতে পারে। শিক্ষকরা এসব লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করতে পারলে বাল্যবিবাহের আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিশুদের বিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখতে হবে এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। কোনো শিশুকে ঝরে পড়তে দেওয়া যাবে না।

সভায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন উপজেলার শিক্ষকরা বিদ্যালয়ভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে শিক্ষক, অভিভাবক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত নজরদারি বাড়ানোর কথা বলেন তাঁরা।

ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের মবিলাইজেশন অ্যান্ড সিস্টেম স্ট্রেংদেনিং অফিসার পার্থ প্রতীম বাগচী বলেন, বিদ্যালয়কে শুধু পাঠদানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, শিশু সুরক্ষার একটি প্রাথমিক সতর্কীকরণ কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী হঠাৎ বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত হলে তার কারণ অনুসন্ধান করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সভায় দুর্যোগপ্রবণ ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর শিশুদের সুরক্ষা নিয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, কক্সবাজারের মতো বহুমাত্রিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিদ্যালয়, পরিবার, প্রশাসন ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এবং সমন্বিত পদক্ষেপের কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

সভা শেষে ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থী শনাক্তকরণ, তথ্য সংরক্ষণ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। মাঠপর্যায়ে শিশু সুরক্ষা ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শিক্ষকদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বানের মধ্য দিয়ে সভার সমাপ্তি ঘটে।