সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলজ সম্পদ ও প্রতিবেশব্যবস্থা সুরক্ষায় পর্যটন খাতকে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধবভাবে পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে হাউসবোট নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত নৌপথ অনুসরণ, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় ইঞ্জিনচালিত নৌযানের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বন্ধ, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার রোধ এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুক্রবার সকালে সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে ‘টাঙ্গুয়ার হাওর জলাভূমি সম্পদের সঠিক ব্যবহার’ শীর্ষক পরামর্শ সভা ও কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম। অনুষ্ঠানে টাঙ্গুয়ার হাওর জলাভূমি প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের কার্যক্রম এবং জলাভূমির সম্পদের বিচক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে মূল প্রবন্ধ ও উপস্থাপনা করেন প্রকল্প পরিচালক সাহেদা বেগম।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন উপসচিব আমিরুল কায়সার, পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ, সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস রঞ্জন শীল, তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান মানিক এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সুনামগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, পরিবেশকর্মী, গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মীরা কর্মশালায় অংশ নেন।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে হলে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও তার কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। পর্যটনের নামে যাতে হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য হাউসবোটগুলোকে একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনা প্রয়োজন।

তারা বলেন, হাওরের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে ইঞ্জিনচালিত নৌযানের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। পর্যটক ও নৌযান চলাচলের জন্য নির্ধারিত নৌপথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে হাওরের তলদেশ, জলজ উদ্ভিদ ও বিভিন্ন জলজ প্রাণীর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব কমানো সম্ভব হবে।

কর্মশালায় হাওরে কৃষিকাজের ক্ষেত্রেও পরিবেশগত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে ফসল উৎপাদনে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারের কারণে হাওরের পানি, মাছসহ জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, তা কমাতে কৃষকদের সচেতন করা এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনা জোরদারের পরামর্শ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া হাওর রক্ষায় অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের পরিবর্তে পরিকল্পিতভাবে ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি হিজল-করচসহ স্থানীয় জলসহিষ্ণু দেশীয় বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে হাওরের প্রাকৃতিক বনায়ন বাড়ানো এবং জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও আলোচনায় উঠে আসে।

পর্যটনকেন্দ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন বক্তারা। হাউসবোট ও পর্যটকদের মাধ্যমে যাতে প্লাস্টিক, পলিথিন, খাবারের উচ্ছিষ্টসহ কোনো ধরনের বর্জ্য হাওরে না পড়ে, সেজন্য কার্যকর সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও অপসারণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।

বক্তারা আরও বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি এবং জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আধার। হাওরের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, মৎস্যসম্পদ, কৃষি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ফলে পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের পাশাপাশি হাওরের প্রতিবেশব্যবস্থা সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তাদের মতে, টাঙ্গুয়ার হাওরকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখতে প্রশাসন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, নৌযান মালিক, পরিবেশ অধিদপ্তর, গবেষক ও পরিবেশকর্মীদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দায়িত্বশীল পর্যটন নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সুযোগও বাড়বে।

কর্মশালার আলোচনায় শেষ পর্যন্ত ‘পরিবেশ রক্ষা করে পর্যটনের বিকাশ’—এই নীতিকে সামনে রেখে টাঙ্গুয়ার হাওরের জলাভূমি সম্পদের সঠিক, বিচক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।