উত্তরাঞ্চলের একসময়ের প্রাণবন্ত নৌপথ বানার নদী আজ নাব্যতা হারিয়ে প্রায় বিলীনের পথে। অথচ এই নদীকে ঘিরেই এখনো টিকে আছে শতবর্ষী ঐতিহ্য উত্তর বাহিনী মেলা। প্রতিবছরের মতো এবারও অক্ষয় তৃতীয়া উপলক্ষে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার দাওগাঁও ইউনিয়নের শুশুতি গ্রামে বসেছে এই মেলা।
জামালপুর ও ময়মনসিংহ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত প্রায় ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৪৩ মিটার প্রশস্ত বানার নদী একসময় ছিল বাণিজ্যিক নৌযানের গুরুত্বপূর্ণ পথ। নদীপথে চলাচল করত অসংখ্য পণ্যবাহী নৌকা। তবে সময়ের ব্যবধানে পলি জমে নদীটি হারিয়েছে তার নাব্যতা ও জৌলুস।
তবুও নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি এখনো জীবন্ত রেখেছে এই অঞ্চলের ঐতিহ্য। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অক্ষয় তৃতীয়া অত্যন্ত পবিত্র দিন হিসেবে বিবেচিত। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে ভগবান বিষ্ণুর অবতার পরশুরামের জন্ম হয়। একই দিনে শ্রীকৃষ্ণ তার বন্ধু সুদামাকে আশীর্বাদ করেন এবং দ্রৌপদীকে অক্ষয়পাত্র দান করেন বলেও পুরাণে উল্লেখ আছে। এছাড়া এই দিনেই মহাভারতের রচনা শুরু এবং গঙ্গার মর্ত্যে আগমনের কথাও প্রচলিত।
অক্ষয় তৃতীয়া উদ্‌যাপন কমিটির জানায়, দেশের অধিকাংশ নদী দক্ষিণমুখী হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হলেও বানার নদীর একটি অংশ শুশুতি এলাকায় উত্তর দিকে প্রবাহিত। এই ব্যতিক্রমী প্রবাহের কারণেই উত্তর বাহিনী নামকরণ। এ উপলক্ষে অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে নদীতে পবিত্র স্নান করেন ভক্তরা, আর সেই স্নানকে কেন্দ্র করেই বসে মেলা।
স্থানীয় বাসিন্দা সত্তর ঊর্ধ্ব জামাল উদ্দিন বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখছি এই ঐতিহ্যবাহী মেলায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শতশত মানুষ আসে। সকাল থেকেই শুরু হয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বানার নদীতে গোসল করা ।
বানার নদীতে স্নান করতে আসা জয়া রানী (৪৫) বলেন আমাদের বাপ দাদারা এই নদীতে স্নান করছে, আমরাও সেই বিশ্বাস থেকে এখানে এসেছি স্নান করতে।
২০২৬ সালের অক্ষয় তৃতীয়া পালিত হয়েছে ১৯ এপ্রিল। এদিন সকাল ১০টা ৪৯ মিনিটে তৃতীয়া তিথি শুরু হয়ে পরদিন ২০ এপ্রিল সকাল ৭টা ২৭ মিনিটে শেষ হয়। এ উপলক্ষে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, জামালপুর ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ঢল নামে।
মেলাকে ঘিরে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। এখানে বসেছে নানা ধরনের দোকানপাট। শিশুদের খেলনা থেকে শুরু করে গৃহস্থালি সামগ্রী, মৃৎশিল্প ও কুটিরশিল্পের বাহারি পণ্যে ভরে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ।
স্থানীয়দের আশা, নদীর নাব্যতা হারালেও এই ঐতিহ্যবাহী মেলা আগামী দিনেও বেচে থাকবে মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও স্মৃতির অংশ হয়ে।