নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত—বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের জন্য একটি পৃথক দ্বিপক্ষীয় আমন্ত্রণও দেওয়া হয়েছিল। ভারত বলেছে, দুটি আমন্ত্রণই পৃথক ছিল। অন্যদিকে ঢাকা স্পষ্ট করেছে, ব্রিকসের আমন্ত্রণটি দেওয়া হয়েছিল বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়। ফলে প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে অংশ নেননি এবং বাংলাদেশ থেকেও কোনো সরকারি প্রতিনিধি পাঠানো হয়নি।

এই ঘটনাকে কেবল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের তাৎক্ষণিক টানাপোড়েন দিয়ে ব্যাখ্যা করলে এর বৃহত্তর কূটনৈতিক তাৎপর্য হয়তো আড়ালে থেকে যাবে।

কারণ ব্রিকস এখন আর শুধু একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক জোটের নাম নয়। সময়ের সঙ্গে এর সদস্যসংখ্যা বেড়েছে, বিস্তৃত হয়েছে এর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিসর। বাণিজ্য, অর্থায়ন, উন্নয়ন সহযোগিতা, বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প কাঠামো নিয়ে এর আলোচনা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ২০২৬ সালের সম্মেলনেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও আর্থিক সংযোগের বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য তাই ব্রিকসের মতো একটি প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি হতে পারে কূটনৈতিক যোগাযোগ, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্বের একটি অতিরিক্ত দরজা।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতা বহুমাত্রিক। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অংশীদার। ভৌগোলিক অবস্থান, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও নিরাপত্তার কারণে ভারত বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য প্রতিবেশী। একই সঙ্গে রাশিয়া ও অন্যান্য উদীয়মান শক্তির সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক রয়েছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম শক্তি হতে পারে কৌশলগত ভারসাম্য ও নমনীয়তা।

ঢাকার সামনে কোনো একটি ভূরাজনৈতিক শিবির বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশগ্রহণ করলেই সেটিকে সেই ফোরামের সঙ্গে রাজনৈতিক বা কৌশলগত একাত্মতা হিসেবে দেখারও কারণ নেই। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিনিয়োগ, বাজার, প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার স্বার্থে যত বেশি কার্যকর যোগাযোগের পথ খোলা রাখা যায়, ততই তার কূটনৈতিক পরিসর বাড়ে।

তবে কৌশলগত নমনীয়তা আর কৌশলহীনতার মধ্যে পার্থক্য আছে।

ঢাকার সিদ্ধান্তের পেছনে যদি এই বার্তা থাকে যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফরটি একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবেই হওয়া উচিত, তাহলে সেটি একটি সুস্পষ্ট কূটনৈতিক অবস্থান। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে দ্বিপক্ষীয় সফরের সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু প্রতিটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্তেরই একটি সুযোগব্যয় থাকে।

একটি বহুপক্ষীয় সম্মেলন শুধু আনুষ্ঠানিক বৈঠকের জায়গা নয়। একই টেবিলে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের উপস্থিতি, আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বাইরের যোগাযোগ, অনানুষ্ঠানিক আলোচনা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তি তৈরির সুযোগ—এসবও কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশ অতীতেও ব্রিকসের আউটরিচ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। ২০২৩ সালে জোহানেসবার্গ এবং ২০২৪ সালে কাজানে অনুষ্ঠিত আউটরিচ আয়োজনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ছিল; ২০২৫ সালে রিও ডি জেনেইরোর আউটরিচ অধিবেশনে বাংলাদেশ অংশ নেয়নি।

তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—বাংলাদেশের ব্রিকস সম্মেলনে যাওয়া বাধ্যতামূলক ছিল কি না।

প্রশ্ন হওয়া উচিত—উপস্থিত থাকার সুযোগটি বাংলাদেশের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে কীভাবে কাজে লাগানো যেত?

এখানে বিমসটেকের প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ার। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক এই আঞ্চলিক সংগঠন বাংলাদেশকে শুধু একটি সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি আঞ্চলিক সহযোগিতার নেতৃত্বদানকারী দেশ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ দিয়েছে।

এই অবস্থান থেকে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নিলে বাংলাদেশ চাইলে নিজের স্বার্থের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তর সহযোগিতা, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও উন্নয়ন প্রশ্নও সামনে আনতে পারত।

অর্থাৎ, ব্রিকসের টেবিলে বসা মানেই ব্রিকসে যোগ দেওয়া নয়। বরং কখনো কখনো একটি দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে—সে কীভাবে নিজের স্বার্থের কথা সেই টেবিলে তুলে ধরছে।

অবশ্য অনুপস্থিতিও কূটনীতির একটি ভাষা।

কখনো অনুপস্থিতি কোনো নীতিগত অবস্থানকে স্পষ্ট করে। কখনো তা একটি সম্পর্কের কাঙ্ক্ষিত কাঠামো সম্পর্কে বার্তা দেয়। কিন্তু সেই অনুপস্থিতির সঙ্গে যদি বিকল্প কূটনৈতিক উদ্যোগ না থাকে, তাহলে সেটি ধীরে ধীরে একটি সুযোগ হারানোর কারণও হয়ে উঠতে পারে।

এখানেই বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের কূটনীতি শুধু কতটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হলো, কতটি আমন্ত্রণ পেল বা কতটি সম্মেলনে উপস্থিত হলো—তার হিসাব দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। আসল প্রশ্ন হলো, সেই উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিকে কতটা কার্যকর জাতীয় স্বার্থে রূপান্তর করা গেল।

বাংলাদেশ প্রতিটি আন্তর্জাতিক টেবিলে স্থায়ী আসন পাবে না—এটাই বাস্তবতা। কিন্তু কোন টেবিলে যাবে, কোন টেবিলে কী বলবে এবং সেখানে গিয়ে কী অর্জন করতে চায়—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশের আছে।

২০২৬ সালের ব্রিকস-পর্বের শিক্ষা তাই শুধু বাংলাদেশের অনুপস্থিতি নয়।

বরং শিক্ষা হলো—প্রতিটি কূটনৈতিক অনুপস্থিতির একটি উদ্দেশ্য থাকা প্রয়োজন, আর প্রতিটি কূটনৈতিক উপস্থিতির প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট কৌশল।

বাংলাদেশের জন্য সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে—অনুপস্থিতিকে যেন কখনো কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় পরিণত হতে না দেওয়া হয় এবং উপস্থিতিকে যেন কখনো নিছক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখা না হয়।