বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের নাম উচ্চারিত হয় একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, সফল সংগঠক এবং গ্রামীণ উন্নয়নের অগ্রদূত হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়কে উত্তরণের পথচলায় তিনি শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম ভিত্তি ছিল – “বাংলাদেশের উন্নয়নের পথ গ্রাম বাংলার উন্নয়নের মধ্য দিয়েই প্রসারিত হবে।”
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, কৃষি উৎপাদন ছিল নিম্নমুখী, খাদ্য ঘাটতি ছিল প্রকট এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ছিল চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে দেশের কৃষি খাতকে পুনর্গঠন করা ছিল সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি সুসংগঠিত ও বাস্তবমুখী উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করেন।
১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী ভাষণে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, বাংলাদেশের দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক মুক্তির প্রধান উপায় হলো কৃষির আধুনিকায়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধি। তাঁর নেতৃত্বে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য উচ্চফলনশীল বীজের ব্যবহার, সারের সহজলভ্যতা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়। কৃষি গবেষণার ফল মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপতি জিয়ার কৃষি উন্নয়ন দর্শনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তাঁর সরাসরি মাঠমুখী নেতৃত্ব। তিনি রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করতেন, তাদের সমস্যা শুনতেন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির উপায় নিয়ে আলোচনা করতেন। এ কারণে তিনি দ্রুত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করেন এবং একজন জনবান্ধব রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
কৃষি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান বাধা ছিল সেচ সংকট। স্বাধীনতার পর দেশের অল্পসংখ্যক জমি সেচ সুবিধার আওতায় ছিল এবং অধিকাংশ কৃষক বৃষ্টিনির্ভর চাষাবাদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এই বাস্তবতায় জিয়া সরকার ব্যাপকভিত্তিক খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি গ্রহণ করে। ১৯৭৯ সালে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল পুনরুদ্ধার করা হয়। ফলে কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পায়, জলাবদ্ধতা কমে এবং উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বরেন্দ্র অঞ্চলে গভীর নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগও পরবর্তী কৃষি উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে।
কৃষকদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য স্বল্পসুদে কৃষিঋণ বিতরণ কার্যক্রম চালু করা হয়। ১৯৭৭ সালে বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে বিশেষ কৃষিঋণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, যার ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা সহজে ঋণ সুবিধা লাভ করেন। বর্গাচাষিদের জন্য ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধি এবং খাসজমি বন্দোবস্তে অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে কৃষিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথ সুগম করা হয়।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘোষিত ঐতিহাসিক ১৯ দফা কর্মসূচিতে কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রাধিকারের পর্যায়ে উন্নীত করা হয়। সেখানে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং কৃষকের জীবনমান উন্নয়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছিল। এই কর্মসূচি শুধু রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র ছিল না; বরং তা ছিল জাতীয় উন্নয়নের একটি দীর্ঘমেয়াদি ভিশন।
কৃষির পাশাপাশি মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও বনজ সম্পদের উন্নয়নেও জিয়া সরকার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে। পরিত্যক্ত পুকুর ও জলাশয় সংস্কার, মাছ চাষ সম্প্রসারণ, উন্নত জাতের হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর বিস্তার এবং পশুচিকিৎসা সেবার সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির বহুমুখীকরণ ঘটানো হয়। ফলে কৃষকের আয় বৃদ্ধির নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়।
১৯৮০ সালে প্রণীত দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেও কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কৃষি প্রযুক্তির আধুনিকীকরণ, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, বনায়ন সম্প্রসারণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে পাট, রেশম ও রাবার উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপতি জিয়ার উন্নয়ন দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’ কর্মসূচি। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিদেশি সাহায্যনির্ভরতার পরিবর্তে দেশের নিজস্ব সম্পদ, শ্রম ও উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন সম্ভব। এই কর্মসূচির আওতায় গ্রাম পর্যায়ে স্বনির্ভর সমিতি গঠন, বৃক্ষরোপণ, মাছ চাষ, হাঁস-মুরগি পালন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগ বিকাশে জনগণকে সম্পৃক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়নের একটি অংশগ্রহণমূলক মডেল গড়ে ওঠে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের প্রভাব শুধু তাঁর শাসনামলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকের সক্ষমতা উন্নয়ন, সেচ সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতায় তাঁর নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
বাংলাদেশের কৃষি ইতিহাসে অনেক রাষ্ট্রনায়কের অবদান থাকলেও কৃষিকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন, কৃষককে উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা এবং গ্রামবাংলাকে রাষ্ট্রীয় নীতির মূল ফোকাসে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। কৃষি, কৃষক ও পল্লী উন্নয়নের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার আজও বাংলাদেশের উন্নয়ন চিন্তায় প্রাসঙ্গিক এবং অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
কৃষিবিদ মোঃ শামীম রেজা
যুগ্ম আহ্বায়ক,
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল