সন্তান বা নাতি-নাতনির নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পরও কি বাবা-মা বা দাদা-দাদি জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন? দান করার পর মালিকানা কার কাছে থাকবে, আর ব্যবহার ও ভোগের অধিকারই বা কার থাকবে?

বাংলাদেশের ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে নতুন বিধান যুক্ত হওয়ার পর এসব প্রশ্নের আইনি কাঠামো বদলে গেছে। ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতীয় সংসদে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। নতুন বিধানে নির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তি দান করার পরও দাতার জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

আইনটি মূলত এমন একটি পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে, যেখানে বাবা-মা জীবিত অবস্থায় সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর নিজের বসতবাড়ি বা সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যাতেও বলা হয়েছে, বিদ্যমান আইনে দাতার জীবনকাল পর্যন্ত ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে দানের বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান ছিল না।

হালিমা বেগমের ঘটনা যে প্রশ্ন সামনে এনেছিল

বরিশালের গৌরনদীর ৮২ বছর বয়সী হালিমা বেগমের ঘটনা এ ধরনের ঝুঁকির একটি আলোচিত উদাহরণ। স্বামী শাহজাহান মৃধা মৃত্যুর আগে তাঁর নামে ৬৪ শতাংশ জমি লিখে দিয়েছিলেন। পরে হালিমা সেই জমি বড় ছেলে মাহাবুব আলম মৃধার নামে লিখে দেন। এরপর ছেলে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিলে ওই সম্পত্তির ওপর নিজের ভোগদখলের দাবি কার্যকর করার মতো অবস্থায় তিনি ছিলেন না। ঘটনাটি ২০২২ সালে সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়।

নতুন আইনের সমর্থকেরা মনে করছেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সম্পত্তি হস্তান্তরের সময় দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার আইনি দলিলে সংরক্ষিত রাখার সুযোগ প্রবীণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা তৈরি করতে পারে।

নতুন আইনে কী বদলেছে

সংশোধিত আইনে ১২২এ ও ১২২বি নামে নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে। ১২২এ ধারার আওতায় নির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তি দান করলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন।

এই ব্যবস্থায়—

বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি দিতে পারবেন;
সন্তান বাবা-মাকে সম্পত্তি দিতে পারবেন;
দাদা-দাদি বা নানা-নানি নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দিতে পারবেন;
নাতি-নাতনিও দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে সম্পত্তি দিতে পারবেন;
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও এভাবে সম্পত্তি দান করা যাবে।

বিধানটি ধর্মনিরপেক্ষভাবে সব ধর্মের মানুষের জন্য প্রযোজ্য হবে।

অর্থাৎ, একজন বাবা তাঁর বাড়ি ছেলের নামে দান করতে পারেন, কিন্তু দলিলে নিজের জীবদ্দশায় ওই বাড়ি ব্যবহার ও ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে মালিকানা এবং জীবনকালীন ভোগাধিকারকে পৃথকভাবে বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হবে।

শুধু মৌখিক ঘোষণা যথেষ্ট নয়

স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে এই সুবিধা নিতে নিবন্ধিত দলিলের প্রয়োজন হবে। ফলে পারিবারিক সমঝোতা, মৌখিক প্রতিশ্রুতি বা শুধু মুখে বলা কথার ভিত্তিতে জীবনকালীন ভোগাধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভবিষ্যতে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে দাতার অধিকার নির্ধারণে নিবন্ধিত দলিলই প্রধান আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

গ্রহীতা আগে মারা গেলে কী হবে?

নতুন ব্যবস্থায় দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় গ্রহীতা মারা গেলেও দাতার সংরক্ষিত জীবনকালীন ভোগাধিকার শেষ হবে না। আইন অনুযায়ী গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে সম্পত্তির অধিকার যেতে পারে, কিন্তু দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত তাঁর সংরক্ষিত ভোগাধিকার বহাল থাকবে।

দান করার পর কি সম্পত্তি ফেরত নেওয়া যাবে?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নতুন বিধানে এ ধরনের দান নিবন্ধনের পর সাধারণভাবে একতরফাভাবে তা প্রত্যাহারের সুযোগ রাখা হয়নি।

নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দাতা ও গ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে পরিবর্তন বা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকতে পারে। আবার সংশ্লিষ্ট পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ বা আইনগতভাবে অক্ষম হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

তাই সম্পত্তি দান করলেই পরে দাতা নিজের ইচ্ছায় একতরফাভাবে তা ফেরত নিতে পারবেন—এমন ধারণা সঠিক নয়।

হেবা ও শরিয়াহ নিয়ে কেন বিতর্ক

বিলটি পাসের পর সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে মুসলিমদের হেবা, অসিয়ত ও ফারায়েজ ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন বিধানের সম্পর্ক নিয়ে।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে বিলটির বিভিন্ন দিক নিয়ে আপত্তি তুলে বলেন, এর সঙ্গে কোরআন-সুন্নাহর মূলনীতির সাংঘর্ষিকতা আছে কি না, তা আরও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার দাবি জানান।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকও নতুন ১২২এ ও ১২২বি ধারা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল প্রশ্ন হলো—দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগ ও নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রেখে অন্যের নামে মালিকানা হস্তান্তর করলে শরিয়াহর দৃষ্টিতে প্রকৃত হস্তান্তর ও ‘কবয’ কীভাবে বিবেচিত হবে।

অন্যদিকে সরকারের অবস্থান ভিন্ন। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে বলেন, নতুন ব্যবস্থাটি হেবা নয়; এটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি। ১২২এ(৪) উপধারায়ও বলা হয়েছে, নতুন বিধানের কারণে প্রচলিত গিফট, হেবা বা অন্য কোনো স্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তরের বৈধতা ক্ষুণ্ন হবে না।

রুমিন ফারহানা: ‘বৃদ্ধ বাবা-মাকে স্বস্তি দেবে’

জাতীয় সংসদের স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানা ৭ সেপ্টেম্বর এক ফেসবুক পোস্টে সংশোধনীকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের এই পরিবর্তন দেশের অসংখ্য বৃদ্ধ বাবা-মাকে স্বস্তি দিতে পারে।

তিনি বলেন, অনেক পরিবারে বাবার কাছ থেকে সম্পত্তি নেওয়ার পর সেই বাবা-মাকেই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। তাঁর মতে, নতুন আইনের ১২২এ(৪) ধারায় হেবা বিধান সংকুচিত না করার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। তিনি আইনমন্ত্রীকে ধন্যবাদও জানান।

আইনবিদদের দৃষ্টিতে সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

আইনটির মূল সুবিধা হলো—সম্পত্তি দান করার পরও দাতার জীবনকালীন নিরাপত্তার জন্য একটি স্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে এটি বসতবাড়ি ও সম্পত্তির ব্যবহার নিয়ে অনিশ্চয়তা কমাতে পারে।

তবে এর বাস্তব প্রয়োগে কিছু প্রশ্নও সামনে আসতে পারে। মালিকানা এক ব্যক্তির কাছে এবং জীবনকালীন ভোগাধিকার অন্য ব্যক্তির কাছে থাকলে ভবিষ্যতে সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবহার, বিক্রি বা অন্যভাবে হস্তান্তর নিয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে।

মুসলিম পরিবারে নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে হেবা, কবয ও উত্তরাধিকার আইনের বাস্তব সম্পর্ক নিয়েও আদালত ও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সামনে নতুন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে।

এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। আইনটি বাস্তবে প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ, আদালত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সিদ্ধান্ত ও ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে এর ব্যবহারিক সীমা আরও স্পষ্ট হবে।

সাধারণ মানুষের জন্য পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

১. সম্পত্তি দান করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আজীবন ভোগাধিকার থাকবে না।
নতুন আইনের নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

২. স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিল প্রয়োজন।
জীবনকালীন ভোগাধিকার দলিলে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।

৩. মালিকানা ও ভোগাধিকার পৃথক হতে পারে।
সম্পত্তির মালিকানা গ্রহীতার কাছে গেলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ভোগের অধিকার রাখতে পারেন।

৪. গ্রহীতা আগে মারা গেলেও দাতার সংরক্ষিত ভোগাধিকার বহাল থাকতে পারে।

৫. দান করার পর একতরফাভাবে সম্পত্তি ফেরত নেওয়ার সুযোগ সাধারণ নিয়ম নয়।
নির্দিষ্ট আইনি শর্ত ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

সব মিলিয়ে, নতুন সংশোধনীটি শুধু সম্পত্তি দানের নিয়মে পরিবর্তন নয়; এটি সম্পত্তির মালিকানা ও জীবনকালীন ভোগাধিকারকে আলাদা করে দেখার একটি নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। এর লক্ষ্য বিশেষ করে প্রবীণ দাতাদের নিরাপত্তা বাড়ানো হলেও, মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের সঙ্গে এর ব্যবহারিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ বিরোধ নিষ্পত্তির প্রশ্নে নজর থাকবে।