ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর তিন দশক পেরিয়ে গেলেও তাঁর মৃত্যুর রহস্যের নিষ্পত্তি হয়নি। চার দফা তদন্তে মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হলেও তা মেনে নেয়নি তাঁর পরিবার। নতুন করে হত্যা মামলা হওয়ার পর আবারও বিচারের আশায় আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে পরিবারটি।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের নিজ বাসা থেকে সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃত্যুর পর প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা হলেও পরে তাঁকে হত্যার অভিযোগ তুলে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করা হয়।

দীর্ঘ তদন্তে সিআইডি, বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং পরে পিবিআই হত্যার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পায়নি। ২০২০ সালে পিবিআইয়ের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনেও বলা হয়, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও জব্দ করা আলামত পর্যালোচনায় হত্যার কোনো প্রমাণ মেলেনি। এরপর ২০২১ সালে আদালত আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।

তবে ওই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হয়নি সালমান শাহর পরিবার। তাঁর মা নীলা চৌধুরী তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন এবং ছেলের মৃত্যুর পেছনে হত্যার অভিযোগ তুলে নতুন করে তদন্তের দাবি জানান।

২০২৫ সালের অক্টোবরে ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক পরিবারের করা রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদের অভিযোগ ও ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়।

নতুন মামলায় ইতোমধ্যে খল অভিনেতা মোহাম্মদ আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার না করায় প্রশ্ন তুলেছেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী।

লন্ডন থেকে তিনি বলেন, “আশায় আছি, মামলার তদন্ত শেষ হবে, বিচার হবে।”

নীলা চৌধুরীর দাবি, অন্য আসামিরাও দেশে রয়েছেন এবং তাঁদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মৃত্যুর রহস্য বেরিয়ে আসতে পারে। তাঁর ভাষায়, আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হত্যার সব রহস্য বেরিয়ে আসবে।

মামলার বাদী সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুমও দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার ও বিচার শেষ করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সালমান শাহর মৃত্যুর বিচার শুধু তাঁর পরিবার নয়, দেশের মানুষও চায়।

তবে তদন্ত সংস্থা এখনো নতুন মামলার তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, একজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

তিন দশকের আইনি লড়াই

সালমান শাহর মৃত্যুর পর ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে জানায়, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। পরিবার ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করলে ২০০৩ সালে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। ২০১৪ সালে দেওয়া সেই তদন্ত প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।

এরপর নীলা চৌধুরী ২০১৫ সালে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন। তাঁর অভিযোগের পর মামলাটি র‌্যাব তদন্তে নিলেও ২০১৬ সালে আদালতের আদেশে র‌্যাব তদন্ত থেকে সরে যায়। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই।

চার বছর তদন্ত শেষে পিবিআই ২০২০ সালে জানায়, সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ তারা পায়নি। প্রতিবেদনে তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের বিভিন্ন বিষয়কে আত্মহত্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

কিন্তু পরিবারের আপত্তির কারণে বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়নি। ২০২১ সালে আসামিদের অব্যাহতির আদেশের পরও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। অবশেষে ২০২৫ সালে রিভিশন আবেদন মঞ্জুরের মধ্য দিয়ে হত্যা মামলার নতুন তদন্তের পথ তৈরি হয়।

সালমান শাহর মৃত্যুর ৩০ বছর পর এখন নতুন তদন্তেই নির্ভর করছে সেই বহুল আলোচিত প্রশ্নের উত্তর—এটি আত্মহত্যা, নাকি হত্যাকাণ্ড?

মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর মেলেনি।