নাটোরের লালপুরে দলীয় কার্যালয়ে বসে সংবাদ সম্মেলন করেছেন বহিষ্কৃত উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মারুফ আলী। বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে উপজেলার গোপালপুর রেলগেট এলাকায় অবস্থিত দলীয় কার্যালয়ে তিনি এ সংবাদ সম্মেলন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে মারুফ আলী দাবি করেন, গত ২১ আগস্ট কেশবপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে “মিথ্যা ও ভুয়া” সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি এসব সংবাদকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
লিখিত বক্তব্যে মারুফ আলী বলেন, এর আগে ১৯ আগস্ট কেশবপুর গ্রামের গোরস্থানের জন্য সরকারি বরাদ্দ হিসেবে পাওয়া ৩৫টি গাছ ও পাঁচ বস্তা সারের হিসাব গ্রামের প্রধান গোকুলের কাছে জানতে চান তিনি। তাঁর দাবি, হিসাব চাইলে গোকুল তাঁকে ‘তুমি কে, এসব হিসাব দেব’ বলে জবাব দেন এবং পরে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।
মারুফ আলী আরও অভিযোগ করেন, পাঁচ বস্তা সারের মধ্যে এক বস্তা গোরস্থানে ব্যবহারের পর বাকি চার বস্তা আত্মসাৎ করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের সমর্থনে সংবাদ সম্মেলনে কোনো নথি বা প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তা তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি।
তিনি দাবি করেন, ওই বিরোধের জের ধরেই ২১ আগস্টের ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়। খেলায় নিজেকে প্রধান বা বিশেষ অতিথি করার চেষ্টা এবং গোপালপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র নজরুল ইসলাম মোল্লাকে প্রধান অতিথি করার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
মারুফ আলী বলেন, আমন্ত্রণপত্রে যখন কোনো প্রধান অতিথি বা বিশেষ অতিথির নাম উল্লেখ ছিল না, তখন তাঁর পক্ষ থেকে প্রধান বা বিশেষ অতিথি হওয়ার দাবি করার প্রশ্নই আসে না। তাঁর ভাষ্য, মূলত ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে তিনি ‘ভিলেজ পলিটিক্সের’ শিকার হয়েছেন।
বহিষ্কার নিয়ে মারুফ আলীর বক্তব্য
সংবাদ সম্মেলনে নিজের বহিষ্কারের বিষয়েও বক্তব্য দেন মারুফ আলী। তাঁর দাবি, গত ১৪ আগস্ট বাউয়েটের একটি অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শরমীন পুতুলের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আব্দুস সালামের সঙ্গে তাঁর কথাকাটাকাটি হয়। ওই সময় তাঁকে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
মারুফ আলী বলেন, ১৯৯৭ সালে বাবার কাঁধে চড়ে তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি। ছাত্রদলের রাজনীতি করতে গিয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়, অর্থ-বিত্ত ও বিভিন্ন সুযোগ হারিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের সময়ে শুধু ছাত্রদলের রাজনীতির কারণে তাঁর ১৩টি সরকারি চাকরি হয়নি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত সংবাদকে ব্যবহার করে জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মারুফ ইসলাম সৃজনকে ফোন করে তাঁকে বহিষ্কারের জন্য প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শরমীন পুতুল নির্দেশ দিয়েছেন—এমন তথ্য প্রচার করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এ তথ্য মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এতে প্রতিমন্ত্রীরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
মারুফ আলী বলেন, ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট ফজলুর রহমান পটলের মৃত্যুর পর রাজনৈতিকভাবে ফারজানা শরমীন পুতুলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং তিনি তাঁকে ছোট ভাইয়ের মতো দেখেন। এ সময় তিনি প্রতিমন্ত্রীকে কথিত চাটুকার ও নাম ভাঙিয়ে চলা ব্যক্তিদের থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
নিজের বহিষ্কারাদেশ পুনর্বিবেচনার আশাবাদ ব্যক্ত করে মারুফ আলী বলেন, তাঁর বহিষ্কারের বিষয়টি দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিশেষভাবে বিবেচনা করবে বলে তিনি আশা করেন।
অভিযোগ অস্বীকার সংশ্লিষ্টদের
কেশবপুর গ্রামের প্রধান গোকুল মারুফ আলীর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
গোপালপুর পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম সুমন বলেন, রেলগেটের দলীয় কার্যালয়টি সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে। দলীয় নেতাকর্মীদের অনুপস্থিতির সুযোগে বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা মারুফ আলী সেখানে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয় নেতাকর্মীরা আপত্তি জানালে তিনি ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে দাবি করেন সুমন।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী আব্দুস সালামও মারুফ আলীর অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। মারুফ আলীর সঙ্গে তাঁর কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে সংগঠন মারুফ আলীকে বহিষ্কার করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এদিকে বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতার অভিযোগের বিষয়ে লালপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হারুনার রশিদ পাপ্পুর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
**প্রতিবেদকের নোট:**
সংবাদ সম্মেলনে মারুফ আলী যেসব অভিযোগ করেছেন, সেগুলো তাঁর বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কয়েকটি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সরকারি বরাদ্দের গাছ ও সার আত্মসাৎ, বহিষ্কারের পেছনে কারও নির্দেশনা এবং ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে পূর্বের ঘটনাবলির সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ যাচাই প্রয়োজন।