মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর—বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় সংগ্রাম, প্রতিকূলতা ও নেতৃত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক পরিচিত নাম। রাজপথের আন্দোলন থেকে দলীয় নেতৃত্ব, কারাবরণ থেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—রাজনীতির নানা বাঁক পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে বিএনপির এই প্রবীণ নেতা।
দলীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে বঙ্গভবনের পথে তার সম্ভাব্য যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অর্জন নয়, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সংগ্রাম থেকে নেতৃত্বের কেন্দ্রে
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র মির্জা ফখরুল যুক্ত ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে। শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষকতা ও শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত থাকার পর ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে শুরু হয় তার জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ পথচলা।
এরপর তিনি হয়ে ওঠেন বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ। দল যখন নানা সংকট, আন্দোলন ও রাজনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে গেছে, তখন সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থানের সময়ে দলের মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বের বড় দায়িত্বও তার কাঁধে এসে পড়ে।
রাজপথের কর্মসূচি, আদালত প্রাঙ্গণ কিংবা সংবাদ সম্মেলন—বিভিন্ন সময়ে বিএনপির প্রধান মুখ হিসেবে তাকে দেখা গেছে। নিজের হিসাব অনুযায়ী, রাজনৈতিক জীবনে ১১ বার কারাবরণ করেছেন তিনি; সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন বছর কারাগারে কাটিয়েছেন।
রাজনীতির উত্তরাধিকার
রাজনীতির সঙ্গে ফখরুলের পরিবারের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন মুসলিম লীগের রাজনীতিবিদ এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। দীর্ঘ ১৭ বছর ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়রও ছিলেন তিনি।
তার চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের ইয়ুথ পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। আরেক চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন জিয়াউর রহমান সরকারের ভূমিমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং পরে খালেদা জিয়ার আইনমন্ত্রী।
তবে পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের সরল উত্তরাধিকারী হননি ফখরুল। বরং তার রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে ঊনসত্তরের গণআন্দোলন ও বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির পরিবেশে।
দল থেকে রাষ্ট্রের পথে
বিএনপি সরকারে থাকাকালে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন ফখরুল। পরে দলের মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন সংগঠনকে। সংকটের সময়ে তার শান্ত স্বভাব, পরিমিত বক্তব্য এবং রাজনৈতিক সৌজন্য তাকে দলের ভেতরে-বাইরে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
তার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—কথায় কোমলতা থাকলেও রাজনৈতিক অবস্থানে প্রয়োজনের সময় দৃঢ় থাকা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন, মামলা, কারাবরণ ও ক্ষমতার পালাবদল—সবকিছুর মধ্য দিয়ে সেই বৈশিষ্ট্যই আরও স্পষ্ট হয়েছে।
এবার সেই দীর্ঘ পথচলার সামনে এসেছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্ভাবনা। দল ও সরকারের গণ্ডি পেরিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হলে মির্জা ফখরুলকে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের অভিভাবকের ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করতে হবে।
রাজনীতির মাঠের পরিচিত মুখ থেকে বঙ্গভবনের সম্ভাব্য বাসিন্দা—ফখরুলের এই যাত্রা তাই শুধু পদ পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের অধ্যায়ও হতে পারে।