দারিদ্রতা, নিত্যদিনের অভাব-অনটন কোনো কিছুই দমাতে পারেনি সাইবা আক্তার মিলিকে। সকল প্রতিক‚লতাকে পেছনে ফেলে তার অদম্য শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সদ্য প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে।

সাইবা আক্তার মিলি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মজলিশপুর ইউনিয়নের বাকাইল গ্রামের আবুল কাশেমের মেয়ে। মিলি বাকাইল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এস.এস.সি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলো। তার সাফল্যে স্কুলের শিক্ষক, পরিবারের সদস্যরা ও গ্রামবাসী আনন্দিত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাইবা আক্তার মিলির পিতা আবুল কাশেম একজন মানসিক প্রতিবন্ধি। মা গৃহিনী। মিলিরা তিন বোন। বড় বোন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী, ছোট বোন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। মিলির এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে এক কঠিন সংগ্রামের গল্প।

মিলির স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে এগিয়ে আসেন মা ও মামা। মা সংসারের কাজের পাশাপাশি হাঁস-মুরগি লালন-পালন করেন। সেই হাঁস-মুরগি বিক্রির সামান্য টাকায় চলে সংসার। মিলির পড়াশোনার খরচ চালাতে মামা প্রায়ই সাহায্য সহযোগিতা করেছেন।

সাইবা আক্তার মিলি বলেন, যতটুকু পড়তাম বুঝে পড়তাম। সেই পড়া থেকে নোট করতাম। মুখস্ত পড়তাম না, যা পড়তাম বুঝে পড়তাম। দৈনিক ৪/৫ ঘন্টা পড়তাম।
মিলি জানায়, রানা স্যার তাকে পড়ার ব্যাপারে অনেক সাহায্য করেছে। স্যারের কাছে সাধারণ গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন ও উচ্চতর গণিত প্রাইভেট পড়তাম। স্যার আমার কাছ থেকে কখনো টাকা নিত না। বড় বোন পড়ার জন্য শাসন করতো। বাবা ও মা পড়তে উৎসাহ দিতো।

তিনি আরো বলেন, আমার বাবা এক সময় প্রচুর কবিতা লিখত। সারারাত জেগে কবিতা লিখতো এবং দিনে মোবাইল দেখত। অষ্টম শ্রেণীতে আমি একবার পরীক্ষায় খারাপ করায় বাবা তখন খুব কান্না করেছিল। এটা আমার মনে দাগ কাটে।

তিনি আরো জানান, সকল বিষয়ে ৮০ উপরে নম্বর পেয়েছি। শুধু সাধারণ গণিতে ৭৬ পেয়েছি।সাধারণ গণিতে কেন কম নম্বর পেয়েছি তা আমার বোধগম্য হচ্ছো না। এটার জন্য আমি বোর্ডে চ্যালেঞ্জ করব। আমি আশা করি সাধারণ গণিতেও আমি ৯০ এর উপর নম্বর পাব।

তিনি আরো জানান, নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি দুইটা প্রাইভেট পড়াতাম। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এখনো তেমন নাই, তবে স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়ালেখার স্বপ্ন অঅছে। বাংলাদেশের পড়ার সিস্টেম ভালো লাগে না। তাই বিদেশ যেতে চাই। ইউটিউবে অন্যান্য দেশের কৃষ্টি কালচার বেশি দেখি।

মিলির মা রীনা বেগম জানান, তার স্বামী আগে কসমেটিকের ব্যবসা করতো। ব্যবসার পাশাপাশি কবিতা লেখালিখি করতো। ৫ বছর আগে সে মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন থেকে সে আর কোন কাজ করতে পারে না। তিন মেয়ে ও স্বামী নিয়ে তিনি সংসার চালাচ্ছেন। তার পায়েও সমস্যা। অনেক কষ্ট করে সংসার চলাতে হয়। সংসার চালাতে হাঁস-মুরগি লালন-পালন শুরু করি।

তিনি আরো বলেন, সংসার চালাতে কষ্ট হলেও তিন মেয়ের পড়ালেখা বন্ধ করিনি। আমার মেয়ে সকলের দোয়া ও তার চেষ্টায় এই ফলাফল করেছে। মেয়ের পছন্দ মত কলেজেই ভর্তি করাব। মেয়ের পড়ার খরচ আমার ছোট ভাইয়েরা সব সময় সাহায্য করে।

তিনি আরো জানান, মিলির পড়া-লেখার ব্যাপারে তার বড় মেয়ে তাকে খুব শাসন করতো। পড়ার জন্য খুব বকাঝকা করত।

এ ব্যাপাওে বাকাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক পংকজ চৌধুরী বলেন, অদম্য ইচ্ছা ও শক্তির কাছে হার মেনেছে দারিদ্রতা। মিলি আমাদের স্কুলের গর্ব। ওর ফলাফলে আমরা খুব খুশি। ও যতটুকু পড়তো মন দিয়ে পড়তো। মিলি খুব শান্ত স্বভাবের একটা মেয়ে।
###
ছবি সংযুক্তঃ-
###

ব্রাহ্মণবাড়িয়া
তারিখঃ-১৪-০৮-২০২৬ ইং
মোবাইলঃ-০১৭১৬-৭৯২৭৮২।