নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলায় এক অর্থোপেডিক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগে একজনের মৃত্যুর পাশাপাশি আরও তিনজন গুরুতর জটিলতায় ভুগছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের স্বজনদের দাবি, অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণ, পচন ও স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির কারণে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
অভিযোগের মুখে থাকা চিকিৎসক ডা. জাহিদুল ইসলাম, গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ। তিনি উপজেলার একটি বেসরকারি ক্লিনিকে রোগীদের অস্ত্রোপচার করে থাকেন। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
শনিবার ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসকের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।
টিউমার অপারেশনের পর কৃষকের মৃত্যু
অভিযোগ অনুযায়ী, লালপুর উপজেলার দুয়ারিয়া ইউনিয়নের ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের কৃষক ওসমান গণি (৬৫)-এর ঘাড়ের একটি ছোট টিউমার অপসারণের জন্য গত জুন মাসের শুরুতে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার করা হয়।

নিহতের ভাই আলম খান অভিযোগ করেন, অস্ত্রোপচারের কিছুক্ষণ পর চিকিৎসক অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়ে রোগী অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন বলে জানান। পরে রোগীকে বড়াইগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তার অভিযোগ, অস্ত্রোপচারে অবহেলার কারণেই তার ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানান তিনি।
অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণে পা হারানোর শঙ্কা
গুরুদাসপুর পৌর এলাকার বাসিন্দা নাজিমুদ্দিন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হাঁটুতে আঘাত পাওয়ার পর একই চিকিৎসকের কাছে অস্ত্রোপচার করান।
তার অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের কয়েক দিনের মধ্যেই ক্ষতস্থানে সংক্রমণ শুরু হয় এবং দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি হয়নি। বর্তমানে তিনি অন্য একজন অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
চিকিৎসক অধ্যাপক বি. কে. দাম বলেন, রোগীর পূর্ববর্তী অস্ত্রোপচারে বিভিন্ন ত্রুটি ছিল। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না এলে আক্রান্ত পা কেটে ফেলতে হতে পারে।
ভুল অস্ত্রোপচারে হাত অকেজো হওয়ার অভিযোগ
বড়াইগ্রাম উপজেলার ভবানীপুর-আটঘরিয়া গ্রামের বাসিন্দা জহুরা বেগম (৬০) অভিযোগ করেন, হাত ভেঙে যাওয়ার পর অস্ত্রোপচার করানোর পর থেকেই তার হাতে সংক্রমণ দেখা দেয়। বর্তমানে তিনি হাত স্বাভাবিকভাবে নাড়াতে পারেন না এবং দৈনন্দিন কাজও করতে পারছেন না।
তার স্বামী আবুল বাশার বলেন, স্ত্রীর চিকিৎসায় বিপুল অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানান।
অস্ত্রোপচারের সময় ড্রিলের অংশ শরীরে রেখে সেলাইয়ের অভিযোগ
গুরুদাসপুর উপজেলার সিধুলী গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম পা ভেঙে যাওয়ার পর একই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে অস্ত্রোপচার করান।
তার স্বামী লাল চাঁন মোহাম্মদ অভিযোগ করেন, অস্ত্রোপচারের পর ক্ষতস্থানে সংক্রমণ দেখা দেয়। পরবর্তীতে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়া হলে পরীক্ষায় অস্ত্রোপচারের সময় ব্যবহৃত ড্রিল মেশিনের একটি ভাঙা অংশ হাড়ের ভেতরে রয়ে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে।
ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধান ডা. আয়ুব আলী বলেন, রোগীকে গুরুতর সংক্রমণ নিয়ে ভর্তি করা হয়েছিল। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায়, হাড়ের ভেতরে ধাতব অংশ রয়ে গেছে এবং হাড় সংযোজনের প্লেট ও স্ক্রু যথাযথভাবে স্থাপন করা হয়নি। এতে রোগীর জটিলতা বেড়ে যায়।
চিকিৎসকের বক্তব্য
সব অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, তিনি কোনো রোগীর অপচিকিৎসা করেননি।
তিনি বলেন, “অনেক সময় হাড় জোড়া লাগতে বিলম্ব হয় বা পুনরায় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। এটিকে অপচিকিৎসা বলা ঠিক নয়।”
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
নাটোরের সিভিল সার্জন ডা. মশিউর রহমান বলেন, চিকিৎসকের বিরুদ্ধে একজনের মৃত্যু বা একাধিক রোগী পঙ্গুত্বের মুখে পড়ার বিষয়ে তার কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিবেদন বা অভিযোগ পৌঁছেনি।
তিনি বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।