নীল জলরাশি, প্রবালসমৃদ্ধ সৈকত আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর‌্যে ঘেরা সেন্ট মার্টিন দ্বীপে আবারও শুরু হতে যাচ্ছে পর্যটকদের পদচারণা। তবে এবারের আনন্দযাত্রার সামনে রয়েছে কঠোর বিধিনিষেধের দীর্ঘ তালিকা। প্রবাল, কেয়াবন ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপটির ভঙ্গুর প্রতিবেশ রক্ষায় পর্যটন নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।          

দীর্ঘ নয় মাসের বিরতি শেষে আগামী ১ নভেম্বর খুলছে দ্বীপের পর্যটনদ্বার। তবে অবাধ পর্যটনের সুযোগ থাকছে না, অনলাইন ট্রাভেল পাস, কিউআর কোডযুক্ত টিকিট, পর্যটকসংখ্যার নির্ধারিত সীমা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ ফিসহ নানা শর্তের মধ্য দিয়েই দ্বীপে প্রবেশ করতে হবে পর্যটকদের। ফলে পর্যটনের প্রত্যাবর্তন ঘিরে উচ্ছ্বাস থাকলেও প্রকৃতি সংরক্ষণের কঠোর অনুশাসনে এবার শর্তের শিকলেই উন্মুক্ত হচ্ছে সেন্ট মার্টিন।

       এবার টেকনাফ রুট পুরোপুরি বন্ধ, সেন্টমার্টিন যেতে হলে এবার একমাত্র ভরসা কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাট। নানা বিধিনিষেধের দৈনিক গড়ে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক, জনপ্রতি ১০০ টাকা সংরক্ষণ ফি এবং জাহাজ চলাচলে অনুমোদন। এবারের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের শর্ত। নভেম্বর মাসে পর্যটকেরা দ্বীপে রাত কাটাতে পারবেন কি না, তা নিয়ে পর্যটন ব্যবসায়ী, জাহাজমালিক ও প্রশাসনের মধ্যে দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তি। ফলে পর্যটনের প্রত্যাবর্তন ঘিরে উচ্ছ্বাস থাকলেও শর্তের বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে অবকাশযাপনের প্রত্যাশা।

         পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ২৫ অক্টোবরের নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে ১৫ মার্চ ২০২৭ পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আগের ১২ দফা নির্দেশনা বহাল থাকায় পর্যটকদের নির্ধারিত নিয়ম মেনেই দ্বীপে যেতে হবে। এসব নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড, পর্যটকসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত পর্যটন মৌসুম, রাত্রিযাপনে বিধিনিষেধ, অনুমোদিত জাহাজে যাতায়াত,পরিবেশ সংরক্ষণ ফি, প্লাস্টিক ও পলিথিন নিয়ন্ত্রণ, রাতে আলো ও শব্দ নিয়ন্ত্রণ, কেয়াবন ও কেয়া ফল সুরক্ষা, সৈকতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ,সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ,নজরদারি ও বিধি বাস্তবায়ন, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত তদারকি নিশ্চিত করা।

    পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার অঞ্চলের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন। তিনি বলেন, নতুন প্রজ্ঞাপনে রাতযাপনের বিষয়ে দ্রুত সমাধান হবে। মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বছরের শেষ দুই মাস অর্থাৎ ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসজুড়েই কেবল পর্যটকেরা দ্বীপে রাত্রিযাপন করতে পারবেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করার কথা জানালেন তিনি।

       পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের গত ২৫ অক্টোবরের নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াত করতে পারবেন। গত ১২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভায় দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পর্যটকের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিয়ে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

    এবার নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এবার টেকনাফ রুট বন্ধ রেখে পর্যটকদের কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটিঘাট থেকে ট্রাভেল পাস নিয়ে জাহাজে উঠতে হবে। এই সম্পূর্ণ চেইন নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামছে পুলিশ ও বিশেষ টাস্কফোস। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও নৌপরিবহন অধিদপ্তর কোনো জাহাজকে সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলের অনুমতি নেই।

     সি ক্রুজ অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে চার দিনের মধ্যে জাহাজ চলাচল শুরু করার আশা করছেন তাঁরা। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কর্ণফুলী, বার আউলিয়া ও এমভি টেকনাফ এই তিনটি জাহাজ প্রস্তুত রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৩০০। আরও অন্তত ছয়টি জাহাজ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর, নৌপরিবহন অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের অনুমোদন নিশ্চিত করাকে জটিল প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন জাহাজ পরিচালনাকারীরা।

    দ্বীপের ব্যবসায়ী তৈয়ব উল্লাহ ক্ষোভ ও স্বস্তি প্রকাশ করে বলেন ৯ টা মাস আমরা কীভাবে চলছি কেউ খবর রাখেনি। ধার দেনা করে পরিবার চালাইছি। দ্বীপ খুলে দেওয়ায় আমরা খুশি, একই সুর শোনা গেল দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দা ও ভ্যানচালক রহমত আলীর কণ্ঠে, পর্যটনই আমাদের আয়ের প্রধান উৎস। দ্বীপে কোনো চাষবাস নাই, কলকারখানা নাই। পর্যটকদের ভ্যান চালাইয়া যা পাই, তা দিয়ে বছরের বাকি দিনগুলো চলে। সরকার কড়াকড়ি করুক, কিন্তু সাধারণ মানুষের রুটি রুজির যেন ক্ষতি না হয়।

   সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন ,১ নভেম্বর থেকে দ্বীপ খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তে বাসিন্দারা অত্যন্ত আনন্দিত এবং আমরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমরা প্রশাসনকে আশ্বস্ত করেছি, পর্যটকরা যেন পরিবেশের ক্ষতি না করে তা স্থানীয়ভাবে আমরা তদারকি করব।

       বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি এখন না বাঁচালে সেন্টমার্টিন মানচিত্র থেকে হারাবে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সেন্টমার্টিনের প্রবাল ক্ষয়, অনিয়ন্ত্রিত রিসোর্ট নির্মাণ এবং প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য দিয়ে আসছেন। এই নজিরবিহীন কড়াকড়িকে সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত মনে করেন। সেন্টমার্টিন কোনো সাধারণ বালুর দ্বীপ নয়, এটি একটি জীবন্ত প্রবাল প্রাচীর। গত কয়েক বছরে এখানে ধারণক্ষমতার চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি পর্যটক গেছে, যার বর্জ্য ও প্লাস্টিক প্রবালগুলোকে মেরে ফেলছে। কেয়াবন কেটে যেভাবে রিসোর্ট করা হয়েছে তা আত্মঘাতী।

কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের নতুন সুপার নিশাত এঞ্জেলা জানান, সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমরা শতভাগ প্রস্তুত। নুনিয়ারছড়া ঘাটে ডিজিটাল চেকিংয়ের মাধ্যমে কিউআর কোডযুক্ত ট্রাভেল পাস নিশ্চিত করেই পর্যটকদের জাহাজে তোলা হবে। দ্বীপে আমাদের বিশেষ টিম সার্বক্ষণিক টহল দেবে। সমুদ্র সৈকতে কোনো ধরনের মোটরচালিত বাইক বা যান চলবে না। রাতের বেলা সৈকতে কোনো আলো বা বারবিকিউ পার্টির মতো উচ্চশব্দ করতে দেওয়া হবে না। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একই সাথে কালোবাজারি রোধ ও পর্যটক সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে জাহাজের টিকিটের পাশাপাশি অনলাইন নিবন্ধন অথবা কিউআর কোডযুক্ত ডিজিটাল ট্রাভেল পাস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

         সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য দ্বীপ খুলে দেয়ার সিদ্ধান্তে বাসিন্দারা অভাবনীয়ভাবে আনন্দিত। বিগত মাসগুলোতে কর্মহীন মানুষের যে হাহাকার আমরা দেখেছি, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দ্বীপের অবরুদ্ধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা কেটে যাবে এবং মানুষের ঘরে দুমুঠো অন্ন জোগানোর সুযোগ তৈরি হবে।

        কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের রাতযাপনের বিষয়ে নতুন নির্দেশনায় স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বুধবার কক্সবাজারে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছে। বৈঠকে পর্যটন করপোরেশন ও বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের চেয়ারম্যান, প্রশাসনের কর্মকর্তা, জাহাজমালিক, হোটেল রেস্তোরাঁ মালিক এবং ট্যুর অপারেটরদের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। তাঁদের মতামত পর্যালোচনা করে রাতযাপনের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। জেলা প্রশাসক জানান, নতুন নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত আগের প্রজ্ঞাপনের শর্তগুলো বহাল থাকবে।