কিছু তথ্য-প্রমাণ ও সরজমিনে পাওয়া অনিয়ম বিষয়ে অবগত করলে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও)। সংশ্লিষ্টদের ডেকে বিষয়গুলো তিনি নিশ্চিত হন। পাশাপাশি শোকজ করা, বিষয়গুলো সমাধানে উদ্যোগি হন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, ইউএইচএফপিও মো. হিমেল খান শারিরিকভাবে অসুস্থ। ঢাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখাতে গিয়ে ফেরত এসেছেন ওই চিকিৎসক অসুস্থ থাকায়। যে কারণে ছুটি কাটানোর কথা থাকলেও মঙ্গলবার তিনি হাসপাতালে আসেন। দুই দিনের অনুপস্থিতির কারণে ওই সময়টার অনেক কিছুই তিনি অবগত নন বলে স্বীকার করে নেন।
সরজমিনে গিয়ে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে যেটুকু বুঝা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লক্সে রয়েছে নানা সংকট। এর মধ্যে চিকিৎসকদের সেবা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। চিকিৎসকরা আসেন নিজেদের খেয়াল খুশি মতো। আসার নির্ধারিত ট্রেন যখন আসে তখনই তারা আসেন এবং রোগী দেখেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ট্রেন বিলম্বে আসে বিধায় রোগীদেরকে অপেক্ষা করতে হয়।
সরজমিন সকাল ৯টা। মোগড়া থেকে আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছেন নার্গিস। চিকিৎসকের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে সময় গড়ায়। কলেজপাড়ার তৌহিদাও অপেক্ষমাণ। তারা অপেক্ষা করছিলেন ডা. আতিয়ার রহমানের জন্য। সকাল ১০টা ৩৬ মিনিট পর্যন্ত ওই চিকিৎসকের অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায় অন্তত ২০-২৫ জনকে। চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনে করে এসে তিনি চেম্বারে বসেন। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক আইয়ুবের অপেক্ষার অবসান হয় ১০টা ৪৭ মিনিটে। তিনি আসেন মহানগর প্রভাতী ট্রেনে।
রামধননগর থেকে আসা নাজমা জানান, তিনি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হাসপাতালে এসেছেন। ডা. আইয়ুবের জন্য তার অপেক্ষা।
এমন কয়েকটি সময়ের হিসাবই যেন মেলে ধরে বহির্বিভাগের বাস্তব চিত্র। দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অথচ আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা ১৫ জন। যদিও তাদের অনেকে সপ্তাহে মাত্র দুই থেকে তিনদিন দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে ডা. রোকেয়া ও ডা. আরিফ উল্লেখযোগ্য।
বিভাগ আছে, বিশেষজ্ঞ নেই
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির বড় দুর্বলতা বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবায়। চক্ষু বিভাগে নেই চক্ষু চিকিৎসক। সেখানে উপসহকারী মেডিকেল অফিসারের মাধ্যমে সেবা চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তাও তিনি সপ্তাহে একদিন আসেন। ওনাকে দায়িত্ব পালন করতে হয় জেলা সদরে।
গাইনি বিভাগ নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন আসেন। ফলে নারী ও প্রসূতি রোগীদের নিয়মিত সেবা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েচে। অনেকে এও অভিযোগ করেছেন যে একজন কনাসলটেন্ট থাকার পরও টিকিট কাউন্টার থেকে ইচ্ছে করেই তার কাছে রোগী পাঠানো হয় না।
আর অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক না থাকায় বড় কোনো অস্ত্রোপচারও করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় অপারেশনের জন্য রোগীদের জেলা সদরের সরকারি কিংবা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
অ্যাম্বুলেন্স আছে, চালক নেই
হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালক না থাকায় সেটির ব্যবহার নিয়ে সংকট রয়েছে। জরুরি রোগীকে দ্রুত অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রয়োজন হলে এই ঘাটতি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। স্বাস্থ্যসেবার এই গুরুত্বপূর্ণ অংশ যেখানে কয়েক মিনিটের ব্যবধানেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেখানে পরিবহন ব্যবস্থা অনিশ্চিত থাকা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের। তবে মাঝে মাঝে ইউএইচএফপিও’র গাড়ির চালক দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স সেবা কার্যক্রম চালু রাখার চেস্টা করা হয়।
একজনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব
প্যাথলজি বিভাগে রয়েছেন মাত্র একজন কর্মী। ফলে তার অনুপস্থিতিতে বিকল্প জনবল না থাকায় পরীক্ষার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে দীর্ঘ সময় প্যাথলজি বিভাগ বন্ধ থাকতে দেখা যায়।
এক্স-রে বিভাগেও একজন টেকনিশিয়ান দিয়ে কাজ চলছে। তবে এ যন্ত্রটি প্রায়ই অচল থাকে।
জেনারেটর ও আবাসন সংকট
হাসপাতালে জেনারেটর নেই। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিভিন্ন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এই গরমে কষ্ট হচ্ছে ভর্তি থাকা রোগীদেরকে।
এ হাসপাতালে চিকিৎসকদের আবাসন সুবিধাও অপ্রতুল। চিকিৎসক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রয়েছে মাত্র তিনটি কোয়ার্টার। ফলে অধিকাংশকেই বাইরে থেকে যাতায়াত করতে হয়।
এর সঙ্গে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়ার রাস্তার দুরবস্থার অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের।
স্বার্থের সেবা
স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একাধিক চিকিৎসকের শেয়ার থাকার বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। হাসপাতাল এখন অনেকটাই দালালমুক্ত থাকলেও চিকিৎসকরা সুযোগ কাজে লাগিয়ে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফাঁদে ফেলছেন। ব্যবস্থাপত্র লিখে দেওয়ার সময়ই নির্ধারিত ক্লিনিকে যাওয়ার জন্য রোগীদের বলে দেওয়া হয়। ভালো চিকিৎসা নিতে হলে প্রাইভেট চেম্বারে যেতে বলা হয়। গত দুদিন ধরে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লেখালেখিও হচ্ছে।
চিকিৎসকের সেবা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পৌর এলাকার রাধানগরের মো. বিল্লাল হোসেন। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে দুদিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়। ভর্তির পরেরদিন বেলা ১২টার দিকে ডা. আরিফের কাছে গেলে ক্ষেপো যান। এত দেরিতে কেন এলেন বলেন তিনি নানা কথা বলতে থাকেন। একপর্যায়ে ১৬টি ওষুধ লিখে দেন। আর দুটি পরীক্ষা দেন। আমার প্রশ্ন হলো ১২টায় যাওয়াটা কিভাবে দেরি হলো। আর পরীক্ষা না করে তিনি এত ওষুধ কিভাবে লিখলেন। মনে হচ্ছে রেগে গিয়ে তিনি এটা করেছেন।’
তথ্য-প্রমাণ সামনে, কর্মকর্তার আশ্বাস
সরেজমিনে রোগীদের অপেক্ষার সময়সহ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়। তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরার পর বিষয়গুলো নিয়ে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।
ইউএইচএফপিও হিমেল খান এ প্রতিবেদককে বলেন, ’অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের শোকজ করতে বলা হয়েছে। অন্যান্য বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘লোকবলের যে সংকট রয়েচে সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত হলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করি।’