একসময় যে সড়কে পা ফেলতেই সাবধান হতে হতো, এখন সেখানে হাঁটা যাচ্ছে স্বচ্ছন্দে। ফুটপাতজুড়ে নেই দোকানের সারি, সড়কের ওপরও নেই আগের মতো এলোমেলো ভিড়। যানবাহন চলছে আপন গতিতে। পথচারীর চলার পথে ফিরেছে স্বস্তি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর এলাকার সড়ক বাজারের চেনা চিত্রে এমন পরিবর্তনই এখন চোখে পড়ছে। দীর্ঘদিনের যানজট আর পথচারীদের দুর্ভোগ কমাতে নেওয়া একটি উদ্যোগ ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে পুরো এলাকার দৃশ্যপট।
সড়কে ফিরছে শৃঙ্খলা আখাউড়ার প্রাণকেন্দ্র সড়ক বাজার। ব্যস্ত এই সড়ক দিয়েই রেলওয়ে স্টেশনে যেতে হয়। উপজেলার একটি অংশের মানুষকে হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে যেতে হলেও দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিত্যসঙ্গী ছিল যানজট।
শুধু কর্মদিবস নয়, সরকারি ছুটির দিনেও একই চিত্র দেখা যেত। যানজটে আটকে ট্রেন মিস করা, দীর্ঘ সময় রোদে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা ভোগান্তিতে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে অহরহ।
ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা অস্থায়ী দোকান, যত্রতত্র মোটরসাইকেল পার্কিং এবং সড়কের ওপর সিএনজিচালিত অটোরিকশার অবৈধ স্ট্যান্ড পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল।
বছরের পর বছর ধরে স্থানীয়রা সমস্যাটির সমাধান চাইলেও স্থায়ী কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এবার সেই চিত্র বদলাতে উদ্যোগ নেয় আখাউড়া পৌরসভা।
হকারদের জন্য আলাদা জায়গা পথচারী ও যানবাহনের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে আলাদা জায়গা। পৌরসভা-সংলগ্ন খালি জায়গায় তাদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জায়গাটি প্রস্তুত করতে করা হয়েছে ঢালাই, বসার স্থান উঁচু করাসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাজ।
কে কোন জায়গায় বসবেন, তা নির্ধারণে আয়োজন করা হয় লটারির। জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদের মাধ্যমে লটারি সম্পন্ন হওয়ার পর ব্যবসায়ীদের জন্য জায়গাটি উন্মুক্ত করে দেন। সেখানেই গত দুদিন ধরে বসছেন ফুটপাতের ব্যবসায়িরা। এতেই বদলে গেছে সড়কের চিত্র।
রয়েছে পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মো. তানভীর ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের জন্য ৯৮টি বসার স্থান করা হয়েছে। পাশাপাশি মোটরসাইকেল পার্কিংয়ের জন্যও জায়গা রাখা হয়েছে। সেখানে একটি টয়লেটের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তিনি জানান, এসব কাজ করতে প্রায় ১৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
পৌরসভা ও সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগে শুধু হকারদের সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং তাদের ব্যবসার জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি করে দেওয়াকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে একদিকে যেমন সড়ক ও ফুটপাতের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে জীবিকার পথও বন্ধ হচ্ছে না।
এবার নজর বাস্তবায়নে আখাউড়া পৌরসভার পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তাপসী রাবেয়া বলেন, সড়ক বাজারের যানজট সমস্যা দীর্ঘদিনের। স্থায়ী সমাধানের চিন্তা থেকেই হকারদের বসার জন্য নির্ধারিত স্থান করে দেওয়া হচ্ছে। এর পাশে মোটরসাইকেল পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তিনি জানান, জেলা প্রশাসক লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করেন কে কোথায় বসবেন। তবে নির্ধারিত জায়গা খালি হলে সেখানে নতুন করে কাউকে বসার সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও জানান ইউএনও।
তাপসী রাবেয়া বলেন, ‘বিষয়টি বাস্তবায়নে প্রশাসন কঠোর থাকবে। নির্ধারিত স্থানের বাইরে কেউ বসলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে বসার সুযোগ করে দেওয়া দোকানীকেও জরিমানার আওতায় আনা হবে। বিষয়টি সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
দীর্ঘদিনের যানজট আর অব্যবস্থাপনার সঙ্গে অভ্যস্ত আখাউড়ার মানুষ এখন নতুন দৃশ্য দেখছেন। ফুটপাত হাঁটার জন্য, সড়ক চলাচলের জন্য—এই সহজ নিয়মটিই যেন নতুন করে ফিরে আসছে সড়ক বাজারে।
একটি উদ্যোগ কতটা বদলে দিতে পারে চেনা কোনো জায়গার চেহারা, আখাউড়ার সড়ক বাজার এখন তারই উদাহরণ। তবে এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে উদ্যোগটির নিয়মিত বাস্তবায়ন ও সবার সহযোগিতার ওপর।