ময়মনসিংহের গৌরীপুরে উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি ও পালকি গাড়িচালক মানিক মিয়া (৪০) হত্যার ঘটনায় ৮ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ৪-৫ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি ময়মনসিংহ উত্তর জেলা যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক শোয়েব মুন্সিকে (সংবাদে সোয়েব/শোয়েব নামে উল্লেখ) দল থেকে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় যুবদল।

নিহত মানিক মিয়া গৌরীপুর পৌর শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকার সতিশা রোডের বাসিন্দা আজিবুল ইসলামের ছেলে। তিনি গৌরীপুর উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন এবং পেশায় পালকি গাড়ির চালক।

গৌরীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান শুক্রবার (৩ জুলাই) বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, নিহতের স্ত্রী সোমাইয়া আক্তার সেলিনা বৃহস্পতিবার গভীর রাতে গৌরীপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় ৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাত আরও ৪ থেকে ৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। প্রধান আসামি করা হয়েছে জেলা যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক শোয়েব মুন্সিকে।

জমি-সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই হত্যার অভিযোগ

নিহতের ছোট ভাই সুখ মিয়া জানান, শোয়েব মুন্সির সঙ্গে তাদের পরিবারের দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বসে থাকা অবস্থায় ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল মানিক মিয়ার ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে তাকে গুরুতর আহত করে।

পরে আহত মানিককে সতিশা রোড এলাকায় নিয়ে গিয়ে তাঁর স্ত্রী সেলিনার হাতে তুলে দেওয়া হয়। স্বজনরা তাকে প্রথমে গৌরীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোর সাড়ে ৩টার দিকে তিনি মারা যান।

‘মাদক ব্যবসায়ী’ বলার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ

মামলার বাদী সেলিনা আক্তারের অভিযোগ, আহত স্বামীকে তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার সময় অস্ত্রের মুখে তাকে একটি ভিডিও বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে বলতে বলা হয় যে তাঁর স্বামী মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং স্থানীয় লোকজন তাকে মারধর করেছে। পাশাপাশি দ্রুত এলাকা ছাড়ারও হুমকি দেওয়া হয়।

এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি।

বাবার দাফনের পর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিল ছেলে

ঘটনার পর বুধবার ময়নাতদন্ত শেষে মানিক মিয়ার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পরদিন বৃহস্পতিবার বাবার দাফন সম্পন্ন করেই তাঁর ছেলে আদিব মাহমুদ আলিফ এইচএসসি বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় অংশ নেন। গৌরীপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় স্বজনদের কান্নায় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। চোখের পানি মুছতে মুছতে পরীক্ষাকক্ষে প্রবেশ করলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই তিনি পরীক্ষা শেষ করে বেরিয়ে আসেন।

যুবদল থেকে বহিষ্কার

ঘটনার পর বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় যুবদল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, জনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক শোয়েব মুন্সি, গৌরীপুর উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আল ইমরান খান এবং গৌরীপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রিফাত খানকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় যুবদলের নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (দপ্তর) মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বহিষ্কৃত ব্যক্তিদের কোনো কর্মকাণ্ডের দায় দল বহন করবে না। একই সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের তাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

পুলিশের অভিযান অব্যাহত

গৌরীপুর থানার ওসি হাবিবুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত মামলার কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে তাদের আটকে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে।

উল্লেখ্য, হত্যাকাণ্ডের কারণ, হামলার প্রকৃত ঘটনা এবং অভিযোগ অনুযায়ী ভিডিও ধারণে জোরপূর্বক বাধ্য করার বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।