ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও বেলজিয়ামসহ একাধিক দেশে তাপমাত্রা মৌসুমি স্বাভাবিক মাত্রাকে ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়ছে। ফ্রান্সে তীব্র গরমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ১৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে চরম আবহাওয়ার কারণে শিক্ষা, পরিবহন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও চাপের মুখে পড়েছে।

ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কারপেনত্রাস শহরে একটি পারিবারিক গাড়ির ভেতর দুই ও চার বছর বয়সী দুই শিশুকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে চিকিৎসকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন। স্থানীয় তদন্ত কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, তীব্র তাপদাহই মৃত্যুর প্রধান কারণ হতে পারে।

Advertisement

এদিকে ফ্রান্সের বোর্দো অঞ্চলে গরমজনিত স্বাস্থ্য জটিলতায় কয়েকজন প্রবীণের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি প্রচণ্ড গরম থেকে স্বস্তি পেতে নদী, হ্রদ ও জলাশয়ে নামার পর একাধিক ডুবে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ফরাসি নাগরিক নিরাপত্তা সংস্থা জনগণকে কেবল অনুমোদিত ও তত্ত্বাবধানে থাকা স্থানে সাঁতার কাটার আহ্বান জানিয়েছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্তমানে পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপ একটি শক্তিশালী ‘হিট ডোম’ বা তাপবলয়ের প্রভাবে রয়েছে। ‘ওমেগা ব্লক’ নামে পরিচিত এই আবহাওয়াগত পরিস্থিতিতে বায়ুমণ্ডলের একটি স্থির উচ্চচাপ বলয় উত্তর আফ্রিকা ও সাহারা অঞ্চল থেকে আসা উষ্ণ বায়ুকে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখছে। ফলে দিনের পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকছে।

ফ্রান্সের বোর্দো শহরে তাপমাত্রা ৪১.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা ওই অঞ্চলের পূর্ববর্তী রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। মধ্য ফ্রান্সের পুয়াতিয়েতেও প্রায় আট দশকের পুরোনো তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে। দেশজুড়ে হাজার হাজার স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে অথবা পাঠদানের সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়েছে।

স্পেনেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সাধারণত তুলনামূলক শীতল উত্তরাঞ্চলীয় শহর সান সেবাস্তিয়ানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শ্রমঘণ্টা সমন্বয়ের বিধান কার্যকর হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করছে দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয়।

ইতালির অন্তত ১২টি শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তুরিনে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সামাল দিতে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া বিভাগ সতর্ক করেছে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের কিছু এলাকায় জুন মাসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা মহাদেশগুলোর একটি। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মহাদেশটি বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হারে উষ্ণ হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বেলজিয়ামের কয়েকটি বন্যপ্রাণী উদ্ধারকেন্দ্র জানিয়েছে, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে পাখি ও ছোট প্রাণীর মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে। বিশেষ করে ভবনের ছাদ ও উন্মুক্ত স্থানে তাপমাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছানোয় বহু পাখি বাসা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের চলমান তাপপ্রবাহ কেবল একটি মৌসুমি আবহাওয়ার ঘটনা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা, যা ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং পরিবেশের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।