প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ ইবোলার বিস্তার ঠেকাতে কার্যকর টিকা বাজারে আনতে আরও প্রায় নয় মাস সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে World Health Organization।
সংস্থাটির বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. ভাসি মূর্তি জানিয়েছেন, বর্তমানে ইবোলার বুন্ডিবুগিও প্রজাতির বিরুদ্ধে সম্ভাব্য দুটি টিকা তৈরির কাজ চলছে, তবে সেগুলো এখনও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পর্যায়ে পৌঁছেনি।
জেনেভায় ডব্লিউএইচও সদরদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গবেষণা, পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাইসহ পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে উল্লেখযোগ্য সময় প্রয়োজন। ফলে দ্রুত টিকা বাজারে আনার সম্ভাবনা সীমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইরাসটির নতুন ধরন মোকাবিলায় কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে মধ্য আফ্রিকার Democratic Republic of the Congo–এ ইবোলার প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং কয়েকশ মানুষের মধ্যে সংক্রমণ-সদৃশ উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের বড় অংশ দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি ও উত্তর কিভু অঞ্চলের বাসিন্দা। একই সঙ্গে প্রতিবেশী Uganda–তেও সংক্রমণের ঘটনা ধরা পড়েছে, যা আঞ্চলিক স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় গত ১৭ মে ডব্লিউএইচও আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি এখনও বৈশ্বিক মহামারির পর্যায়ে পৌঁছেনি। ডব্লিউএইচও মহাপরিচালক Tedros Adhanom Ghebreyesus বলেন, রোগটির বিস্তার আঞ্চলিকভাবে অত্যন্ত গুরুতর হলেও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার মতো অবস্থা এখনও তৈরি হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইবোলা অত্যন্ত প্রাণঘাতী হলেও এটি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণীর রক্ত, লালা, ঘাম, বমি, মল-মূত্রসহ শারীরিক তরলের সংস্পর্শে এলে সংক্রমণ ঘটে। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত পোশাক, চিকিৎসা সরঞ্জাম কিংবা মৃতদেহ স্পর্শের মাধ্যমেও ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে স্বাস্থ্যকর্মী ও আক্রান্তদের পরিবারের সদস্যরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
ইবোলার উপসর্গের মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, তীব্র দুর্বলতা, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, ডায়রিয়া, বমি এবং পরবর্তী পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ। রোগটি দ্রুত জটিল আকার ধারণ করলে লিভার ও কিডনির কার্যকারিতাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উচ্চ মৃত্যুহারের কারণে ইবোলাকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর ভাইরাসজনিত রোগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ফলখেকো বাদুড়কে ইবোলার প্রাকৃতিক বাহক হিসেবে ধরা হয়। এছাড়া বনাঞ্চলের কিছু বন্যপ্রাণীও ভাইরাসটি বহন করতে পারে। বনজ সম্পদনির্ভর অঞ্চলে মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ বাড়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
ইবোলার বিস্তার ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও জোরদার হচ্ছে। ইতোমধ্যে United Kingdom কঙ্গোতে রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। এই অর্থ স্বাস্থ্যকর্মীদের সহায়তা, রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করা হবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর টিকা আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, আক্রান্তদের আলাদা রাখা এবং সীমান্ত নজরদারি জোরদার করাই ইবোলা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।