জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এখন বিশ্বের অনেক দেশের অগ্রাধিকার। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশেও পরিবেশবান্ধব ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্ব বাড়ছে। সেই ধারাবাহিকতায় রাজধানীতে আধুনিক ও সবুজনির্ভর একটি “ইনার সিটি ক্যাম্পাস” গড়ে তুলেছে BRAC University, যেখানে সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগ বিশেষভাবে নজর কাড়ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির নতুন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে পরিকল্পিত সবুজায়ন, উন্মুক্ত স্থান, জলাধার, ছাদজুড়ে ঘাস ও পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যশৈলী। নগরায়ণের চাপের মধ্যেও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে পুরো অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনের নকশায় প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের প্রবাহ নিশ্চিত করার ফলে বিদ্যুতের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কমানো সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি হাইব্রিড কুলিং সিস্টেম ব্যবহারের কারণে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ওপর নির্ভরতাও হ্রাস পেয়েছে।
ক্যাম্পাসটির অন্যতম বড় আকর্ষণ এর রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা। ভবনের ছাদজুড়ে স্থাপন করা হয়েছে ৩ হাজারের বেশি সোলার প্যানেল, যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ দশমিক ৪ মেগাওয়াট। উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ ক্যাম্পাসে ব্যবহৃত হলেও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম বৃহৎ রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ উদ্যোগ। এর ফলে শুধু বিদ্যুৎ ব্যয় কমছে না, একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে। পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নেও ভূমিকা রাখছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য এমন একটি শিক্ষা পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রযুক্তি, পরিবেশ সচেতনতা ও টেকসই উন্নয়ন একসঙ্গে চর্চা করা যায়। প্রয়াত সমাজসেবক ও Fazle Hasan Abed–এর পরিবেশবান্ধব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ভাবনা থেকেই এই উদ্যোগের সূচনা হয় বলে জানানো হয়েছে।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ সহজ ছিল না। বহুতল ভবনের ছাদে বিশাল সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে গিয়ে প্রকৌশলগত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। বাতাসের চাপ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কাঠামোগত ভারসাম্য এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। কয়েক বছরের ধাপে ধাপে কাজের পর পুরো প্রকল্পটি বাস্তব রূপ পায়।
এ উদ্যোগ এখন শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণা ও বাস্তব শিক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স, স্থাপত্য ও প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থীরা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন নিয়ে সরাসরি কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে ক্যাম্পাসটি এক ধরনের “লিভিং ল্যাবরেটরি” হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্রে তাদের আরও দক্ষ করে তুলবে। একই সঙ্গে এ ধরনের উদ্যোগ দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট খাতের জন্যও একটি কার্যকর উদাহরণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিবেশবিদদের মতে, দ্রুত নগরায়ণের এই সময়ে টেকসই ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী অবকাঠামো নির্মাণ ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে দৃষ্টিকোণ থেকে সৌরশক্তিনির্ভর এই উদ্যোগ বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।