উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আমার অন্যতম একটি কাজ হচ্ছে নিয়মিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করা। এই পরিদর্শনগুলো থেকে সাম্প্রতিক সময়ে একটি নেতিবাচক প্রবণতা আমার চোখে ধরা পড়েছে তা হলো, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতাটি আমি পূর্বের কর্মস্থল কুমিল্লার লাকসাম উপজেলা এবং বর্তমান কর্মস্থল পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা- উভয় উপজেলায় ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করেছি।
পরিদর্শনকালে দেখা যায়, প্রতিটি বিদ্যালয়েই পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্কুল ভবন নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে, বসার জন্য পর্যাপ্ত বেঞ্চ আছে এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষকও আছেন। অবকাঠামোগত কোনো ঘাটতি না থাকার পরেও অনেক স্কুলেই এখন তীব্র শিক্ষার্থী সংকট। উদাহরণস্বরূপ, কলাপাড়া উপজেলার প্রায় ১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০ জনের নিচে; কোনো কোনো স্কুলে তা ৪০ জনের কাছাকাছি বা তারও কম।
লাকসাম এবং কলাপাড়া উভয় উপজেলায় মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান করে এই শিক্ষার্থী হ্রাসের পেছনে মূল যে কারণটি আমি পেয়েছি, তা হলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ঠিক সামনে বা আশেপাশেই অসংখ্য অনানুষ্ঠানিক (ইনফরমাল) মাদ্রাসা বা কিন্ডারগার্টেন গড়ে ওঠা। প্রতিটি বাজার বা মোড়ে এখন ৩ থেকে ৫টি পর্যন্ত মাদ্রাসা দেখা যায়। এমনকি লাকসামের মুদাফফরগঞ্জ বাজারে ১৪টি মাদ্রাসা গড়ে উঠতে দেখেছি। এগুলোর বেশিরভাগই নূরানী, হেফজ বা কওমি মাদ্রাসা।
শিক্ষার্থী স্থানান্তরের এই চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয় নির্দিষ্ট কিছু স্কুলের দিকে তাকালে। যেমন- লাকসামের মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ রয়েছে ১১টি, অথচ সেখানে ২০২৫ এ শিক্ষার্থী মাত্র ১৪১ জন! যেখানে সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী শিক্ষার্থী থাকার কথা ছিল ৪০০ থেকে ৫০০ জন। এর কারণ জানতে চাইলে শিক্ষকরা জানান, ওই স্কুলের ঠিক সামনেই ৪টি মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে এবং স্কুলের ছেলেমেয়েরা সেখানে চলে যাচ্ছে। লাকসাম ও কলাপাড়ার প্রায় প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনেই এখন একাধিক হেফজ, কওমি বা নূরানী মাদ্রাসা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি নূরানী, কওমি বা হেফজ মাদ্রাসার বিপক্ষে নই। তবে প্রাথমিক শিক্ষার ওপর এগুলোর প্রভাব গভীরভাবে ভাববার বিষয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জেনেছি, করোনা মহামারির সময়ে যখন দীর্ঘদিন স্কুল-কলেজ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ছিল, তখন এই মাদ্রাসাগুলো কিন্তু তাদের কার্যক্রম চালু রেখেছিল। ফলে একটা বড় অংশের অভিভাবক বাধ্য হয়েই তাদের সন্তানদের স্কুল থেকে সরিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি করান। এছাড়া অনেক সময় শিক্ষকদের গুণগত মান এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক কারণেও অভিভাবকরা মাদ্রাসামুখী হচ্ছেন।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়, এই অনানুষ্ঠানিক মাদ্রাসাগুলোতে পড়তে হলে শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন দিতে হয়। এছাড়া সেখানে আবাসিক বা অনাবাসিক থাকার জন্য আলাদা খরচ তো আছেই। অথচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ রয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে বই দেওয়া হচ্ছে, উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে এবং নানা উপায়ে ভর্তুকি দিয়ে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। এতকিছুর পরেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা দিন দিন কমছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সার্বিকভাবে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করলে এ কথা স্পষ্ট যে, আমরা যদি আমাদের সম্মানিত শিক্ষকদের পেশাগত মান ও শিক্ষার গুণগত যোগ্যতা আরও বৃদ্ধি করতে না পারি, এবং এই অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা খাতকে সরকারি নীতিমালার আওতায় এনে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়—তবে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় একটি এলোমেলো পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।
আমাদের সমাজে মাদ্রাসা, হেফজখানা, এতিমখানা বা কওমি মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেন অবশ্যই থাকবে। কিন্তু এগুলোকে অবশ্যই একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা উচিত, যেন প্রতিটি মাদ্রাসার কার্যক্রম ও পাঠ্যসূচি সম্পর্কে সরকারের কাছে স্পষ্ট ধারণা থাকে। সর্বোপরি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে এবং এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সম্মানিত শিক্ষক, অভিভাবক এবং আমরা যারা মাঠ প্রশাসনে কাজ করছি- উপজেলা শিক্ষা অফিসসহ সবাইকে সম্মিলিতভাবে অত্যন্ত জোরালো ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।