ঐতিহ্যের ময়মনসিংহ রেলওয়ে জংশন স্টেশনটি বর্তমানে চরম অব্যবস্থাপনা, সীমাহীন অনিয়ম আর প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কালো থাবায় পঙ্গু হয়ে পড়েছে। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ জংশনটি এখন সাধারণ যাত্রীদের জন্য এক আতঙ্কের নাম। অভিযোগের আঙুল খোদ স্টেশন সুপারিনটেনডেন্টের দিকে। তার নেতৃত্বাধীন একটি প্রভাবশালী চক্র নিয়মিতভাবে ট্রেনের সংরক্ষিত টিকিট কালোবাজারে চড়া মূল্যে বিক্রি করছে, যার ফলে সাধারণ যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত টিকিট পাচ্ছেন না। এই সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের অপতৎপরতায় প্রতি মাসে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল দাবি করেছেন।
সোমবার (২০ এপ্রিল) স্থানীয় ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে জড়িতদের বিচারের দাবী জানায়।
সরেজমিনে স্টেশন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে দুর্নীতির এক মহোৎসব। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রেলওয়ের কোটি কোটি টাকার মূল্যবান সম্পদ ও যান্ত্রিক সরঞ্জাম মাটির নিচে চাপা পড়ে নষ্ট হচ্ছে। স্টেশনের ইয়ার্ডে পড়ে থাকা পুরাতন রেললাইন ও সিগন্যালিং যন্ত্রপাতি খোলা আকাশের নিচে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে অকেজো হয়ে পড়ছে, যা দিনের আলোতেই চুরির হাতবদল হচ্ছে। শুধু তাই নয়, রেলওয়ের বিস্তীর্ণ সরকারি জায়গা দখল করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা স্থায়ী ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও বিশাল হাটবাজার গড়ে তুলেছে। মাঝে মধ্যে লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান চললেও অদৃশ্য খুঁটির জোরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুনরায় দখল হয়ে যায় সেই জমি। সাম্প্রতিক সময়ে নাশকতাকারীদের রেললাইন কেটে ফেলার ঘটনা এবং পাগলা থানাধীন দাইরেরপুর এলাকায় রেললাইনে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেওয়ার বিষয়টি জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে, যা রেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এদিকে, বর্তমান স্টেশন সুপারিনটেনডেন্ট আব্দুল্লাহ আল হারুনকে ঘিরে উঠেছে অভিযোগের পাহাড়। গ্রেড-৩ মাস্টার হয়েও তিনি বিধি বহির্ভূতভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে জেঁকে বসেছেন। অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অতিরিক্ত মহা পরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলামের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে তিনি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সরকারের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্টেশনের এক কর্মচারী চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানান,অফিস সহকারী রফিকুল ইসলামের মাধ্যমে হারুন সাহেব হাওর এক্সপ্রেস, যমুনা, অগ্নিবীণাসহ জনপ্রিয় ট্রেনগুলোর টিকিট সরাসরি কালোবাজারিদের হাতে তুলে দেন। এছাড়া জিআরপি পুলিশ, ট্রেনের অ্যাটেনডেন্ট ও পাওয়ার কার থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন তিনি। ব্যবসায়িক স্বার্থে ট্রেনের নির্ধারিত প্লাটফর্ম পরিবর্তন করে দোকানদারদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও এখানে নিয়মিত ঘটছে। এমনকি পারুল বেগমের নামে বরাদ্দকৃত একটি দোকান দ্বিতীয় প্লাটফর্ম থেকে প্রথম প্লাটফর্মে স্থানান্তরের বিনিময়ে এই সিন্ডিকেট ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রেলের বুকিং অফিস থেকে শুরু করে হকারদের ঝুড়ি—সর্বত্রই যেন চাঁদাবাজির মরণকামড়। এদেরকে এখনই থামাতে না পারলে রেল সেবা পথ হারাবে।

ভুক্তভোগী যাত্রী লাইলী আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “৫ আগস্টের পর দেশের অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও ময়মনসিংহের রেলের চিত্র বদলায়নি। হকারদের কাছ থেকে প্রতিদিন প্রকাশ্যে ২০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার বিক্রি হলেও রেল কর্তৃপক্ষ দেখেও না দেখার ভান করে।
” অপর যাত্রী আজিজুল হক বলেন, “যাত্রীদের সুবিধার চেয়ে সিন্ডিকেটের পকেট ভারী করাই যেন এখানে মুখ্য কাজ। দোকানদারদের বেচাকেনা বাড়াতে ট্রেনকে পরিকল্পিতভাবে দূরে রাখা হয়।”
এই অরাজকতা প্রসঙ্গে স্থানীয় নাগরিক নেতা ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, “রেল এখন জনগণের সেবক না হয়ে গুটিকয়েক দুর্নীতিবাজের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। উপর থেকে নিচ পর্যন্ত এই সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে রেলকে বাঁচানো সম্ভব নয়।”
লেখক ও এক্টিভিস্ট আবুল কালাম আল আজাদ বলেন,বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে রেলকে প্রধান গণপরিবহনে রূপান্তর করা জরুরী। কিন্তু তা হয়নি। বাস সিন্ডিকেট সেটা হতে দেয়নি। নানারকম রাষ্ট্রীয় অবহেলার শিকার রেল খাত দুর্নীতি অনিয়মের আখড়া। সরকারের গভীর মনোযোগ এবং সদিচ্ছা ছাড়া এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে উত্তরণ অসম্ভব।
অভিযুক্ত রফিকুল ইসলাম কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে স্টেশন মাস্টারের ওপর দায় চাপালেও সুপারিনটেনডেন্ট হারুন তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সুপারিন্টেনডেন্ট আব্দুল্লাহ আল হারুন বলেন,আমার চেয়ে সিনিয়র এখন কেউ নেই তাই আমাকে এই দ্বায়িত্ব দিয়েছে। হকারদের টাকা আমি নেই না ইউসুফ নামের এক হকার টাকা তুলে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে কেন টাকা নেয়।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) মো: রুপম আনোয়ার বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সাধারণ যাত্রীদের এখন একটাই প্রত্যাশা—আধুনিকায়নের ফাঁকা বুলি নয়, বরং সিন্ডিকেট মুক্ত একটি পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন।