পটুয়াখালীর বাউফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (টিআর/কাবিখা) কর্মসূচির আওতায় নেওয়া ৩১৮টি প্রকল্পে মোট ৩ কোটি ৯২ লাখ ৯৯ হাজার ৬০৪ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে নেওয়া এসব প্রকল্পের অধিকাংশের কাজ না করেই টাকা উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে মাটির রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও মসজিদের মাঠ ভরাট, বিভিন্ন অবকাঠামো মেরামত এবং গভীর নলকূপ স্থাপন।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে প্রকল্পের তালিকার সঙ্গে বাস্তব চিত্র মিলিয়ে দেখা গেছে, ৩১৭টি প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি প্রকল্পে দৃশ্যমান কোনো কাজ নেই। কিছু প্রকল্পে সামান্য কাজ হলেও বরাদ্দের পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ধুলিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ঘুচরাকাঠি আব্দুল জব্বার মৃধা বাড়ির জামে মসজিদ ও ঈদগাহ মাঠ উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ২৬৫ টাকা। স্থানীয়দের দাবি, ঈদগাহ মাঠটি আগে থেকেই পাকা। সেখানে নতুন করে মাটি ভরাটের কোনো কাজ হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, কাজ না হলেও ঈদগাহ মাঠে মাটি ভরাট দেখিয়ে বরাদ্দের টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।
একই স্থানে বায়তুস সালাহ জামে মসজিদের উন্নয়নের নামে আরও ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একই জায়গাকে কেন্দ্র করে ভিন্ন নামে দুটি প্রকল্প দেখিয়ে বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে। মসজিদে সামান্য সংস্কারকাজ করা হলেও ঈদগাহ মাঠ ভরাটের নামে বরাদ্দ করা অর্থের বড় অংশ ব্যয় না করেই উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাউফল ইউনিয়নের দক্ষিণ বিলবিলাস এলাকায় মন্নাত খানের বাড়ি থেকে পল্লী বিদ্যুতের পাকা সড়ক পর্যন্ত মাটির রাস্তা মেরামতের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই রাস্তায় বরাদ্দ অনুযায়ী কোনো মাটি ফেলা বা সংস্কারকাজ করা হয়নি। সরেজমিনেও রাস্তার উন্নয়নে সাম্প্রতিক কোনো কাজের দৃশ্যমান চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কাজ না করেই বরাদ্দের টাকা তুলে নেওয়া অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা ।
ধুলিয়া ইউনিয়নের প্রকল্প তালিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাউফল উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ধুলিয়ার বাসিন্দা শরীফ তৌসিফুর রহমান রাফার দাবি, তালিকায় থাকা দু-একটি প্রকল্প ছাড়া অন্য প্রকল্পগুলোর নাম তিনি কখনো শোনেননি। স্থানীয়ভাবেও এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর বিষয়ে কেউ অবগত নন বলে তিনি জানান। তাঁর মতে, প্রকল্পের তালিকায় ভুয়া বা বাস্তবে বাস্তবায়ন না হওয়া প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়ে থাকতে পারে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ১৫টি ইউনিয়নের প্রকল্প তালিকায় এমন কিছু প্রকল্পের নাম রয়েছে, যেগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোনো কোনো প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করে বরাদ্দের বড় অংশ তুলে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বাউফল পৌর শহরে উপজেলা পরিষদের গেটসংলগ্ন আব্দুল খালেক আকনের ভবনের চতুর্থ তলায় ‘সাংবাদিক ক্লাব’ মেরামত ও সংস্কারের জন্য ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে সরেজমিনে সেখানে বরাদ্দের বিপরীতে কোনো সংস্কারকাজ দেখা যায়নি । ভাড়া নেওয়া ভবনে সরকারি অর্থে মেরামত ও সংস্কারের জন্য এ ধরনের প্রকল্প নেওয়ার বিধান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্পগুলোর তালিকা, বরাদ্দ, প্রকৃত কাজের পরিমাণ, বিল-ভাউচার ও অর্থ উত্তোলনের তথ্য যাচাই করতে প্রতিটি প্রকল্পের সরেজমিন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগের বিষয়ে বাউফল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এসব প্রকল্প তাঁর সময়ে নেওয়া হয়নি, আগের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সময়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি যোগদানের পর যেসব প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন, সেখানে কোনো অনিয়ম পাননি।’ তবে কোথাও প্রকল্পের কাজ না হয়ে থাকলে বা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সালেহ আহমেদ বলেন,’বিধি অনুযায়ী এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। কোন প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন না হলে আমরা সেগুলো করিয়ে নেয়া হবে। অথবা প্রকল্পের সিপিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।