জন্ম থেকেই দৃষ্টিশক্তিহীন। শৈশবেই হারিয়েছেন মা, কৈশোরে বাবা। অভাব-অনটন আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে থাকেননি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার আদমপুর গ্রামের মিজান মিয়া (২৫)। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন তিনি। শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন শিক্ষার্থীদের অধিকার, সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে। তবে উচ্চশিক্ষা শেষ করেও এখনো স্থায়ী কর্মসংস্থান পাননি তিনি। বর্তমানে স্ত্রীর সামান্য আয়ের ওপর নির্ভর করে চলছে তাঁদের সংসার।

মিজান মিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাদেকপুর ইউনিয়নের আদমপুর গ্রামের মৃত খোরশেদ মিয়ার ছেলে। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি ষষ্ঠ। তাঁর বাবা পেশায় রিকশাচালক ছিলেন।

মিজানের ভাষ্য, প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর মা আয়েশা খাতুন মারা যান। এরপর একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় হারান বাবা খোরশেদ মিয়াকে। বাবার মৃত্যুর পরও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বিভিন্নজনের সহায়তা পেয়েছেন তিনি।

২০১৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৬৪ পেয়ে উত্তীর্ণ হন মিজান। ২০১৯ সালে ঢাকার সরকারি বাংলা কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.১৭ পান। এরপর ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন।

২০২৩ সালে একই বিভাগ থেকে সিজিপিএ-২.৭৭ পেয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকেই স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

মিজান জানান, বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত তাঁর পড়াশোনার খরচ বহন করতেন। বাবার মৃত্যুর পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক তাঁকে সহায়তা করেন। পাশাপাশি স্নাতক শেষ করা পর্যন্ত ডাচ্-বাংলা ব্যাংক থেকে প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা করে শিক্ষাবৃত্তি পেয়েছেন।

২০২৩ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার ভাদুঘরের হাবিবা বেগমকে বিয়ে করেন মিজান। পৈতৃক বাড়িতে থাকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় ২০২৪ সালে সদর উপজেলার ঘাটুরা গৌতমপাড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘর বরাদ্দ পান তিনি। বর্তমানে স্ত্রীকে নিয়ে সেখানেই বসবাস করছেন।

মিজানের স্ত্রী হাবিবা বেগম একটি বেসরকারি হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। মাসে তাঁর আয় প্রায় ৮ হাজার টাকা। এই আয় দিয়েই কোনোভাবে তাঁদের সংসার চলছে বলে জানান মিজান। তিনি বলেন, তাঁর স্ত্রীও প্রায়ই অসুস্থ থাকেন এবং দীর্ঘদিন এই কাজ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মিজান এফ রহমান হলে থাকতেন। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অধিকার ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন। দুইবার চাকসু নির্বাচনে সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন বলে জানান তিনি। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

গত ৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে লিখিত আবেদন করেন মিজান। আবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের টেলিফোন অপারেটর পদে বিশেষ বিবেচনায় তাঁকে নিয়োগ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

আবেদনে মিজানের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা, আর্থিক ও পারিবারিক পরিস্থিতি এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর যোগাযোগ দক্ষতা ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় প্রযোজ্য বিধি-বিধান ও যোগ্যতার শর্ত পূরণ সাপেক্ষে টেলিফোন অপারেটর পদে নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ করা হয়েছে।

মিজান মিয়া বলেন, “আমি পুরোপুরি বর্তমানে স্ত্রীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল। আমার স্ত্রী একটি বেসরকারি হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। তাঁর আয়েই সংসার চলে। কিন্তু তিনি অসুস্থ। বেশিদিন চাকরি করতে পারবেন না। তাই আমার একটি চাকরি খুব প্রয়োজন।”

তিনি বলেন, “কোনো করুণা নয়, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ চাই। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক, ইউনিয়ন সমাজকর্মী, সরকারি প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক কিংবা কোনো সরকারি দপ্তরে টেলিফোন অপারেটর হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেলে আমি স্বাচ্ছন্দ্যে দায়িত্ব পালন করতে পারব। সরকার যে কোনো জায়গায় আমাকে বিবেচনা করতে পারে।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরে টেলিফোন অপারেটর হিসেবে নিয়োগের আবেদন প্রসঙ্গে মিজান বলেন, “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে টেলিফোন অপারেটর পদে নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হলে বাকি জীবনটা সুন্দর ও স্বাচ্ছন্দ্যে কাটাতে পারব।”

২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিবন্ধী গ্র্যাজুয়েট পরিষদের সদস্য মিজান। সংগঠনটির মাধ্যমে প্রতিবন্ধী গ্র্যাজুয়েটদের যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ার দাবিতে কাজ করার কথাও জানান তিনি।

মিজানের স্ত্রী হাবিবা বেগম বলেন, “বেসরকারি হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করি। মাসে ৮ হাজার টাকা আয় হয়। এই আয় দিয়ে কোনোভাবে আমাদের সংসার চলছে। বর্তমানে প্রায়ই অসুস্থ থাকি। বেশিদিন চাকরি করতে পারব বলে মনে হয় না। আমার স্বামীকে একটি চাকরির সুযোগ দেওয়া হলে আমাদের সংসার চালানো সহজ হবে।”

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিন সাংবাদিকদের বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে তিনি মিজানের বিষয়ে অবগত হয়েছেন। তাঁকে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর চাকরির বিষয়ে সুপারিশ করার কথাও জানান তিনি।

মিজানের আবেদনটি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনার বিষয়। তাঁর চাওয়া, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতাকে সীমাবদ্ধতা হিসেবে না দেখে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া হোক।