বর্ষার জল আর সবুজের বুকজুড়ে ফুটে থাকা গোলাপি-সাদা পদ্মে যেন নতুন রূপ পেয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার পদ্মবিল। সীমান্তঘেঁষা এই প্রাকৃতিক জলাভূমির অপরূপ দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন জেলার বিভিন্ন এলাকা ও আশপাশের উপজেলার প্রকৃতিপ্রেমীরা। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের পাশাপাশি অনেকেই বিলের সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করছেন।

স্থানীয়দের কাছে ধর্মনগর কালীবাড়ী পদ্মবিল নামে পরিচিত এই জলাভূমি আখাউড়া উপজেলার মনিয়ন্দ ইউনিয়ন এলাকায় অবস্থিত। সরকারি ইউনিয়ন পরিষদের পর্যটন-তথ্যেও মনিয়ন্দ ইউনিয়নের পদ্ম বিল, ঘাগুটিয়া পদ্ম বিল ও মিনারকোট পদ্ম বিলকে পর্যটন স্পট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, বর্তমানে বিলে প্রচুর পদ্ম ফুটেছে এবং এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে দর্শনার্থীদের আনাগোনা বেড়েছে।

পদ্মের রাজ্যে পর্যটকদের ভিড়

ঢাকা থেকে আখাউড়ায় আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে পদ্মবিল দেখতে যান জোনায়েদ হোসেন। তিনি বলেন, আত্মীয়দের কাছে বিলটির কথা শুনে সেখানে যান। পদ্মবিলের সৌন্দর্য দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন।

তাঁর ভাষায়, প্রকৃতির এমন নিজস্ব সৌন্দর্য কাছ থেকে না দেখলে অনেক কিছুই অদেখা থেকে যেত। তবে এই সৌন্দর্য যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

স্থানীয় যুবক কবীর আহম্মেদ বলেন, প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ পদ্মবিল দেখতে আসেন। অনেকে পরিবার নিয়ে আসেন, আবার কেউ কেউ ছোট ডিঙি নৌকায় বিলে ঘুরে পদ্মফুল ও প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করেন।

তবে পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকার কথাও জানান তিনি। তাঁর দাবি, এখানে শৌচাগারসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে দর্শনার্থীদের ভোগান্তি কমবে।

আষাঢ় থেকে কার্তিক—পদ্মের মৌসুম

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পদ্ম ফুটতে শুরু করে এবং আষাঢ় থেকে কার্তিক পর্যন্ত বিলের বিভিন্ন অংশ পদ্মে ভরে ওঠে। পূর্ববর্তী প্রতিবেদনগুলোতেও আখাউড়ার এসব পদ্মবিলে আষাঢ় থেকে কার্তিক পর্যন্ত পদ্ম ফোটার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

পদ্মফুলে ভরা জলাভূমির এই দৃশ্য বর্ষা ও শরৎ মৌসুমে এলাকাটিকে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তোলে। দর্শনার্থীদের অনেকেই নৌকায় করে বিলের মাঝামাঝি গিয়ে ছবি তোলেন এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন।

ফুল ছেঁড়া ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ

দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পদ্মফুল রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক দর্শনার্থী সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি ফুল ছিঁড়ে নিয়ে যান। এতে বিলের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও ফুলের বিস্তার দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আগের বছরগুলোর প্রতিবেদনেও আখাউড়ার পদ্মবিলে দর্শনার্থীদের ফুল ছিঁড়ে নেওয়ার প্রবণতার কথা উঠে এসেছে।

মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহাবুবুল আলম দীপক বলেন, প্রতিদিন সকাল-বিকেলে জেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ পদ্মবিল দেখতে আসেন। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও পদ্মফুল রক্ষায় স্থানীয়ভাবে একটি কমিটি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি একজন গ্রাম পুলিশকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে কেউ পদ্মফুল ছিঁড়ে নিতে না পারেন।

তিনি আরও বলেন, পর্যটকদের সুবিধার জন্য পদ্মবিল এলাকায় একটি ওয়াশরুম স্থাপনের দাবি প্রশাসনের কাছে জানানো হয়েছে।

পর্যটনবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ

আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপসী রাবেয়া বলেন, বর্তমানে পদ্মবিলে প্রচুর ফুল ফুটেছে এবং তিনি নিজেও সেখানে গিয়েছেন। দর্শনার্থীরা যাতে ফুল না ছেঁড়েন, সে বিষয়ে সাইনবোর্ড ও ব্যানার দেওয়া হয়েছিল। তবে কিছু মানুষ সেগুলো সরিয়ে ফেলেছেন এবং ফুল ছিঁড়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

তিনি বলেন, পদ্মফুল রক্ষায় একজন গ্রাম পুলিশকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি আগত দর্শনার্থীদের ফুল না ছেঁড়ার বিষয়ে সচেতন করছেন। পাশাপাশি পদ্মবিলকে আরও সুরক্ষিত করতে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের সঙ্গেও আলোচনা চলছে।

দর্শনার্থীদের সুবিধার বিষয়ে ইউএনও বলেন, সেখানে ওয়াশব্লক ও চেঞ্জিং রুমের প্রয়োজন রয়েছে। এসব সুবিধা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে।

শুধু সৌন্দর্য নয়, গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিও

পদ্মবিলের গুরুত্ব কেবল পর্যটনেই সীমাবদ্ধ নয়। জলাভূমির উদ্ভিদ ও জলজ পরিবেশ স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মের বিস্তার প্রাকৃতিকভাবে বীজ ও ভূগর্ভস্থ কন্দ বা রাইজোমের মাধ্যমে ঘটতে পারে—তাই জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলজ উদ্ভিদ মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর আশ্রয়স্থল তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে জলাভূমির উদ্ভিদ ও পাখির পারস্পরিক সম্পর্ক স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের অংশ। ফলে পদ্মবিল সংরক্ষণে শুধু ফুল নয়, পুরো জলাভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

আখাউড়ার পদ্মবিল নিয়ে আগের প্রতিবেদনগুলোতেও এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পর্যটকদের আগমন এবং পদ্মফুল সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে এসেছে।

প্রকৃতিপ্রেমীদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের সচেতন করে পদ্মবিলের স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষা করা হবে। তাহলে আখাউড়ার এই প্রাকৃতিক জলাভূমি শুধু মৌসুমি বিনোদনকেন্দ্র নয়, পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনস্থল হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।