দুটি পা নেই, কিন্তু থেমে নেই পথচলা। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও আত্মবিশ্বাসে আজও অটুট কুড়িগ্রামের রাজারহাটের সেকেন্দার আলী। প্রায় চার দশক আগে রোগের কারণে হারিয়েছেন দুই পা। হারিয়েছেন পুরোনো পেশা ও উপার্জনের সক্ষমতা। কিন্তু হার মানেননি জীবনের কাছে। হুইলচেয়ারে বসে ছোট্ট একটি পান-সিগারেটের দোকান চালিয়ে শুধু নিজের সংসারই টিকিয়ে রাখেননি, সেই আয় দিয়ে তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন।
সেকেন্দার আলীর বাড়ি রাজারহাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের মেকুরটারী শান্তিনগর গ্রামে। তার বাবা মৃত ঈমান তেলী।
একসময় সেকেন্দার আলী ছিলেন কর্মচঞ্চল যুবক। কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন বড় ভাই আকবর আলীর কাঠের ফার্মে। প্রায় ৪০ বছর আগে কাজের সময় পায়ে লোহার তারকাটা ঢুকে যায়। শুরুতে এটিকে সামান্য আঘাত মনে করে তেমন গুরুত্ব দেননি। পরে ক্ষতস্থানে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসা করিয়েও অবস্থার উন্নতি হয়নি। একপর্যায়ে চিকিৎসকরা ক্যান্সার শনাক্ত করেন।
জীবন রক্ষায় শেষ পর্যন্ত তার দুটি পা কেটে ফেলতে হয়। একসঙ্গে যেন বদলে যায় পুরো জীবন। যে মানুষটি নিজের শ্রমে সংসার চালাতেন, তিনিই হয়ে পড়েন চলাফেরায় অক্ষম। উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় ভাইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। পরে বড় ভাই তাকে বিয়ে দিয়ে আলাদা সংসার করার ব্যবস্থা করেন।
সংসারে আসে এক ছেলে ও তিন মেয়ে। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে নতুন করে বাঁচার পথ খুঁজতে শুরু করেন সেকেন্দার আলী। ভিক্ষা করে জীবন কাটানোর সুযোগ থাকলেও সে পথ বেছে নেননি। বরং নিজের সামান্য সঞ্চয় এবং স্থানীয় শান্তিনগর মসজিদ থেকে পাওয়া সহযোগিতার অর্থ দিয়ে শুরু করেন ক্ষুদ্র ব্যবসা।
হুইলচেয়ারে বসে চালু করেন পান-সিগারেটের দোকান। দোকানটি ছোট হলেও তার স্বপ্ন ছিল বড়। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দোকানে বসে ক্রেতাদের পান-সিগারেট বিক্রি করতেন। অল্প অল্প করে সেই আয় দিয়েই চলতে থাকে সংসার।
সংগ্রামী এই মানুষটির জীবনযুদ্ধের কথা ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। ২০১৫ সালে তৎকালীন রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম তার দোকানে যান। বর্তমানে তিনি দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সেকেন্দার আলী ও তার দোকানে আসা ক্রেতাদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে দোকানের সামনে টাইলস দিয়ে বসার ব্যবস্থা করে দেন তিনি।
পাশাপাশি ‘শিকড়’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেকেন্দার আলীকে একটি হুইলচেয়ার উপহার দেয়। এরপর সেই হুইলচেয়ারে ভর করেই নিয়মিত দোকানে আসা-যাওয়া করেন তিনি। জীবিকার পাশাপাশি স্থানীয় মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের চেষ্টা করেন।
অভাবের সংসারে আয় ছিল সীমিত। তবুও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপস করেননি এই বাবা। বিশেষ করে তিন মেয়েকে ভালোভাবে বড় করে তোলার চেষ্টা করেছেন। দীর্ঘদিনের কষ্টার্জিত অর্থ থেকে সঞ্চয় করে একে একে তিন মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করেন। প্রতিটি বিয়ের পেছনে ছিল তার দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও অসংখ্য ত্যাগ।
মেয়েদের বিয়ে দিতে গিয়ে অর্থকষ্টে পড়লেও কারও কাছে হাত পাতেননি। নিজের ব্যবসার আয় ও সামর্থ্যের মধ্যেই দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিন মেয়েই স্বামীর সংসারে রয়েছেন।
সেকেন্দার আলীর জীবনের গল্প শুধু দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প নয়; এটি আত্মমর্যাদা, পরিশ্রম ও সন্তানদের প্রতি একজন বাবার দায়িত্ববোধের গল্প। দুই পা হারানোর পরও তিনি নিজেকে অসহায় হিসেবে মেনে নেননি। একটি ছোট দোকানকে অবলম্বন করে নিজের পরিবারকে আগলে রেখেছেন।
বৃদ্ধ বয়সেও প্রতিদিন দোকানে বসেন সেকেন্দার আলী। তার কাছে দোকানটি এখন শুধু আয়ের জায়গা নয়—এটি তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আত্মনির্ভরতার প্রতীক।
স্থানীয়রা বলছেন, শারীরিক সক্ষমতা হারিয়েও যে একজন মানুষ নিজের চেষ্টা ও সততার মাধ্যমে পরিবারকে দাঁড় করাতে পারেন, সেকেন্দার আলী তার উজ্জ্বল উদাহরণ। তার জীবনসংগ্রাম সমাজের অসহায় ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্যও হতে পারে অনুপ্রেরণার উৎস।
রাজারহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “বরাদ্দ পাওয়া গেলে তাকে কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।”