দীর্ঘদিনের লোকসান ও উৎপাদন বন্ধের সংকট কাটিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শামছুজ্জামান সুরুজ। তিনি বলেন, বন্ধ থাকা ছয়টি চিনিকলসহ উৎপাদনমুখী সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যায়ক্রমে চালু করার পাশাপাশি চিনিশিল্পে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

শনিবার (২৯ আগস্ট) চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের চিনিকল পরিদর্শন শেষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান বলেন, উৎপাদনমুখী সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রাখা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। বন্ধ চিনিকলগুলো ধাপে ধাপে চালু করে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, শুধু বন্ধ কারখানা খুলে দিলেই চিনিশিল্পের সংকটের সমাধান হবে না। কারখানাগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদনব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত যন্ত্রপাতি সংযোজন করতে হবে। দক্ষ জনবলের ঘাটতি পূরণে প্রয়োজনীয় নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের দক্ষ করে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

দীর্ঘদিনের লোকসানের প্রসঙ্গ তুলে শামছুজ্জামান সুরুজ বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ১৫টি চিনিকলের মধ্যে শ্যামপুর, সেতাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, পাবনা, পঞ্চগড় ও রংপুর চিনিকলের উৎপাদন ২০২০ সালের ডিসেম্বরে বন্ধ হয়ে যায়। এতে শ্রমিক-কর্মচারীদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার আখচাষিরাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

তিনি বলেন, একটি চিনিকলকে শুধু চিনি উৎপাদনের কারখানা হিসেবে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে আখচাষি, শ্রমিক-কর্মচারী, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার বিস্তৃত স্থানীয় অর্থনীতি জড়িত। বন্ধ চিনিকলগুলো চালু করা সম্ভব হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আখচাষ বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো সম্ভব হবে।

চিনিশিল্পকে টেকসই করতে আখচাষিদের উৎপাদনে ফেরানো এবং তাঁদের উৎসাহিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, চাষিদের উৎসাহিত করতে আখের মূল্য প্রতি কুইন্টাল ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২৫ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আখচাষিদের প্রণোদনার পরিমাণ ৬ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ কোটি টাকা করা হয়েছে।

আখচাষিদের পাওনা পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করতে ডিজিটাল ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আখের ওজন সম্পন্ন হওয়ার পরপরই চাষির মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের তথ্য জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে পাওনা অর্থের জন্য আগের মতো বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে না।

এ ছাড়া সফটওয়্যারভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আখচাষিদের আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও চাষাবাদসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

চিনিকলের আধুনিকায়নের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান বলেন, ভবিষ্যতে সরকারি চিনিকলগুলোকে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও স্বনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।

মতবিনিময় সভায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান সভাপতিত্ব করেন।

সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএসএফআইসির সচিব মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান, শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (অডিট) আব্দুল ওয়াহেদ, বিএসএফআইসির অতিরিক্ত পরিচালক (বাণিজ্যিক ও অর্থ) আজহারুল ইসলাম, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (বাণিজ্যিক অডিট) মুহাম্মদ খাদেমুল বাশার এবং খুলনা উপপরিচালক (বাণিজ্যিক অডিট) নাসিফ কবিরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ সময় কেরু অ্যান্ড কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারী, শ্রমজীবী ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ, আখচাষি নেতৃবৃন্দ, বাণিজ্যিক খামারের ইনচার্জ সুমন কুমার সাহা, ডিহি খামারের ইনচার্জ ইমদাদুল হকসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।