রাশিয়ার আমুর গ্যাস কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার আলাল হোসেন রাজু নিহত হয়েছেন। শুক্রবার রাতে তাঁর পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাসের যোগাযোগের পর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাঁর মরদেহ আইনি প্রক্রিয়া শেষে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
আলাল হোসেন রাজু গাংনী উপজেলার মটমুড়া ইউনিয়নের হোগলবাড়িয়া মাঠপাড়া গ্রামের খেড়ু মন্ডলের ছেলে। তাঁর মৃত্যুর খবরে পরিবার, স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
গত ২৫ আগস্ট রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় আমুর এলাকায় নির্মাণাধীন আমুর গ্যাস কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। রুশ কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় মোট ১৫ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকের সংখ্যাই বেশি।
ঘটনার পর মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাস প্রথমে জানায়, কিশোরগঞ্জের ভৈরবের জাকির হোসেন নিহত হয়েছেন এবং মেহেরপুরের আলাল হোসেন রাজু নিখোঁজ রয়েছেন। আগুনে কয়েকটি মরদেহ এতটাই পুড়ে গিয়েছিল যে সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। সে সময় দূতাবাস জানিয়েছিল, আলাল ওই শনাক্ত না হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে থাকতে পারেন।
পরবর্তী সময়ে দূতাবাসের পক্ষ থেকে আলালের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। শুক্রবার রাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, নিহত দুই বাংলাদেশি শ্রমিক—কিশোরগঞ্জের জাকির হোসেন ও মেহেরপুরের আলাল হোসেন রাজুর মরদেহ দেশে ফেরাতে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ১৩ মাস আগে কাজের উদ্দেশ্যে রাশিয়ায় যান আলাল। সে সময় তাঁর স্ত্রী ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। আলাল রাশিয়ায় যাওয়ার মাত্র ১৫ দিন পর তাঁদের একটি পুত্রসন্তান জন্ম নেয়।
স্বজনদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন পর আগামী মাসে দেশে ফেরার কথা ছিল আলালের। প্রবাসজীবনে যে সন্তানকে কখনো কোলে নিতে পারেননি, দেশে ফিরে সেই সন্তানকে দেখার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন আর জীবিত অবস্থায় হচ্ছে না।
আলালের চাচাতো ভাই মহির উদ্দিন বলেন, ‘‘সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো, রাজু বিদেশে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। বিদেশে যাওয়ার ১৫ দিন পর দেশে তার একটি পুত্রসন্তান জন্ম নেয়। সেই সন্তানটিকে দেখতে আগামী মাসে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। অথচ সে দেশে ঠিকই আসবে, তবে জীবিত নয়—মৃত হিসেবে।’’
আলালের ভাই জালাল উদ্দিন জানান, ঢাকায় গিয়ে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের পর তাঁরা তাঁর ভাইয়ের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও তাঁদের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এদিকে দুর্ঘটনায় আহত সাত বাংলাদেশি শ্রমিককে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাশিয়ার বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। দূতাবাস জানিয়েছে, আহতদের চিকিৎসা ও বাংলাদেশিদের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি তারা পর্যবেক্ষণ করছে।
রাশিয়ার আমুর গ্যাস কেমিক্যাল কমপ্লেক্সটি রুশ কোম্পানি সিবুর ও চীনের সিনোপেকের যৌথ উদ্যোগে নির্মাণাধীন একটি বৃহৎ শিল্প প্রকল্প। বিস্ফোরণের সময় কমপ্লেক্সটি এখনও উৎপাদনে যায়নি। আগুনের সূত্রপাত ও শিল্প নিরাপত্তা নিয়ে রুশ কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে।
আলালের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে হোগলবাড়িয়া মাঠপাড়া গ্রামে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ। একদিকে নবজাতক সন্তানকে বাবার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার বেদনা, অন্যদিকে প্রিয়জনকে হারানোর শোক—সব মিলিয়ে পরিবারটির ওপর নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার।