জায়গা নিয়ে বিরোধের জেরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় যাতায়াতের পথ বন্ধ করে এক হিন্দু পরিবারকে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। শৌচাগার ও নলকূপ প্রভাবশালী প্রতিবেশীর বেষ্টনীর ভেতরে পড়ায় দূর্ভোগে পড়েছেন বাড়ির বাসিন্দরা। গত ১২দিন ধরে উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের কর্মকারপাড়ার মন্টু কর্মকার ও তাঁর পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের কর্মকারপাড়ার বাসিন্দা মন্টু কর্মকার ২০০৩ সালে চাচাতো ভাই উত্তম রায়ের কাছ থেকে সাবেক ১৮৯৭ দাগে ৬ দশমকি ৩৩ শতাংশ জমি বায়না দলিল মূলে ক্রয় করেন। ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর দলিল লেখক ও সাবেক ইউপি সদস্য আশিকুর রহমানের মাধ্যমে জায়গা কেনা সংক্রান্ত বিষয়ে দলিল সম্পাদন করেন। দলিলে উত্তম রায় স্বাক্ষরও করেন এবং মিন্টু কর্মকার জায়গা কেনার ৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু সাব রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দেয়ার আগেই উত্তম চলে যান এবং দলিলটি নিবন্ধনও হয়নি।
২০১৭ সালে উত্তম একই জমি প্রতিবেশী সৌদি আরব প্রবাসী রফিক মিয়ার কাছে পুনরায় বিক্রি করে দেন। বিষয়টি জানতে পেরে মন্টু গত এক বছর আগে এবং ৮-৯মাস আগে আদালতে দুটি মামলা দায়ের করেন। এতে রফিকের লোকজন ক্ষুব্ধ হন। গত ৯ আগস্ট রফিকের পরিবারের লোকজন মিন্টু কর্মকারের ঘরের দরজার সামনে বাঁশের বেড়া দেন। মিন্টুর পরিবারের যাতায়াতের পথ বন্ধ হয়ে যায়। এতে মিন্টুর পরিবারের নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ পরিবারের সদস্যরা কার্যত বন্দি হয়ে পড়েছেন। এমনকি পরিবারের ব্যবহারের শৌচাগার ও নলক‚পটি প্রতিবেশী রফিকের দেয়া বেষ্টনীর ভেতরে পড়ে যায়। যে কারণে চরম সংকটে পড়েছেন ভুক্তভোগী এই হিন্দু পরিবারের সদস্যরা। গত ১২ দিন ধরে নিজ বাড়িতে ‘অবরুদ্ধ’ অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন তাঁরা।
মন্টু কর্মকারের পরিবারের লোকজন জানান, ঘরের চৌকাঠ পেরোতেই সামনে প্রতিবেশী রফিকের দেয়া ২০ ফুট লম্বা বাঁশ ও টিনের বেড়া। উঠান থেকে বের হওয়ার পথটিতেও দেয়া হয়েছে ২৫ ফুট দীর্ঘ বাঁশের বেড়া। শুধু যাতায়াতের পথই নয়, ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বাড়ির একমাত্র শৌচাগারটি। বাড়ির নলকূপটি এখন আর চেনার উপায় নেই। পরিত্যক্ত টিন আর ময়লার ভাগাড় দিয়ে সেটি ঢেকে রাখা হয়েছে।
ভুক্তভোগী সুবর্ণা কর্মকার জানান, ৯ আগস্ট দিনের বেলায় ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে আমাদেরকে বের করে দেওয়া হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় ঘরে আসতে পারলেও বাঁশ আর টিনের বেড়া সরানো হয়নি। দিনের আলোয় শৌচাগার ব্যবহারের কোনো উপায় আমাদের নেই। লোকলজ্জা চেপে রাতে প্রাকৃতিক কাজ সারতে পাশের পুকুর পাড়ে ছুটতে হয়। আর এক ফোঁটা খাবার পানির জন্য কলস নিয়ে প্রতিদিনি প্রতিবেশীদের দুয়ারে যেতে হচ্ছে।
মন্টু কর্মকার সাংবাদিকদের জানান, ২০১৪ সালে দলিল করার সময় উত্তমকে ৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা পরিশোধ করি। কিন্তু দলিলে স্বাক্ষর করলেও সম্পাদনের আগেই উত্তম চলে যায়। এরপর দলিলটি আর নিবন্ধন হয়নি। অনিবন্ধিত দলিল দিয়ে আদালতে আমি মামলা করেছি। বর্তমানে রফিক মিয়ার লোকজন বাড়ির চারদিকে বাঁশ ও টিন দিয়ে বেড়া দিয়েছে। মামলা ও বাড়াবাড়ি করলে আমাকে হত্যা করবে বলে হুমকি দিয়েছে। পরিবার নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতা আছি।
সৌদি আরবে থাকায় রফিক মিয়ার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর স্ত্রী জানাহারা বেগম জানান, আমাদের জায়গায় আমরা বেড়া দিয়েছি। আমরা মন্টুর কোনো জায়গায় বেড়া দেয়নি। হামলা-মামলা করলে খুন করা হবে এমন অভিযোগ সত্য না।
মালিক উত্তম রায় দাবি করেন, মন্টু জালিয়াতি করে তার কাছ থেকে দলিলে স্বাক্ষর নিয়েছিলেন। তাই আমার জমি রফিকের কাছে বিক্রি করেছি। মন্টুর সকল অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা তাউস মিয়া বলেন, এই জায়গা প্রথম মন্টু কিনছে। পরে রফিকের কাছে একই জমি বিক্রি করে দিসে উত্তম।
সালিশকারক সুজন পাঠান বলেন, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সালিশ হলেও কোনো পক্ষই ছাড় না দেয়ায় সমাধান হয়নি।
এ ব্যাপারে হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুক মিয়া সাংবাদিকদের জানান, উত্তম রায় থেকে মিন্টু কর্মকার জায়গা কিনেছেন বলে শুনেছি। মিন্টুর কাছে দালিল বা বায়নাপত্র রয়েছে। পরে একজন মুসলমান লোকজন এগিয়ে গিয়ে উত্তমের কাছ থেকে একই জায়গা আবার কিনেছে বলেও শুনেছি। উভয়পক্ষ ডেকে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করব।
এ ব্যাপারে নাসিরনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ও হরিপুর ইউনিয়নের বিট কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেন, উত্তমের কাছ থেকে জায়গা কিনলেও দলিলটি রেজিস্ট্রি হয়নি। মন্টুর লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাদের বাড়িতে গিয়ে বাঁশ ও টিনের বেড়ার কিছু অংশ সরানো হয়েছে। উভয়পক্ষকে থানায় বসে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রস্তাব দেওয়া হলেও কেউই আসেনি।
