সাগরের ঢেউয়ের গর্জনে যে শহর প্রতিদিন জেগে ওঠে, সেই কক্সবাজারেই আজ শোনা গেল আরেক জাগরণের সুর নারীর আত্মনির্ভরতার সুর। বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে কিশোরীদের রক্ষা করতে দক্ষতা অর্জনই যে সবচেয়ে বড় ঢাল, তারই এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে উঠল আজকের এই আয়োজন। তিন মাসের কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে ৩০ জন নারী আজ দাঁড়ালেন নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের মুখোমুখি, তাদের চোখে স্বপ্ন আর আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক নিয়ে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ কক্সবাজারের উদ্যোগে আয়োজিত এই জব ফেয়ার যেন প্রমাণ করে দিল, দক্ষতাই পারে একজন কিশোরীর ভাগ্য বদলে দিতে।
এই জব ফেয়ার প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ ও চাকরির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির এ উদ্যোগকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি কার্যকর মডেল হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুধবার (১৯ আগস্ট) কক্সবাজার শহরের কলাতলী মেইন রোডের দ্য সুইস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের উদ্যোগে এ জব ফেয়ার অনুষ্ঠিত হয়।
আয়োজনে প্রশিক্ষণার্থীদের অর্জিত দক্ষতা, কর্মক্ষেত্রের উপযোগিতা এবং সম্ভাব্য নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনসেবা খাতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা, নিয়োগদাতাদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা এবং ইন্টার্নশিপের সুযোগ নিয়েও মতবিনিময় করেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুষ্ঠানটি সাবলীল ভাবে নিজের মত সঞ্চালনা করেন চাইল্ড প্রটেকশন এডুকেশন অ্যান্ড জিইএস কোঅর্ডিনেটর শাহানাজ পারভীন। এতে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের উপজেলা কো—অর্ডিনেটর জগন্ময় প্রজেস বিশ্বাস।
প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহনেওয়াজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুব্রত বিশ্বাস, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল লতিফ জনী।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের চাইল্ড সেফটি নেট প্রজেক্ট ম্যানেজার সাগর ডি কস্তা, উপজেলা কো—অর্ডিনেটর ছোটন বড়ুয়াসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন চাইল্ড প্রটেকশন, এডুকেশন অ্যান্ড জিইএস কো—অর্ডিনেটর শাহানাজ পারভীন।
প্রধান অতিথি মো. শাহনেওয়াজ বলেন, দক্ষতা উন্নয়ন কেবল কর্মসংস্থানের উপায় নয় এটি সামাজিক সক্ষমতা বৃদ্ধিরও অন্যতম অনুঘটক। প্রশিক্ষিত কিশোরীরা যখন নিজেদের উপার্জনের সক্ষমতা অর্জন করবে, তখন তারা পরিবার ও সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, বর্তমান শ্রমবাজারে শুধু প্রশিক্ষণের সনদ যথেষ্ট নয় প্রয়োজন বাস্তব কর্মদক্ষতা, পেশাগত আচরণ, যোগাযোগ সক্ষমতা ও কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা। হোটেল ম্যানেজমেন্ট খাতে এ দক্ষতাগুলো অর্জন করতে পারলে প্রশিক্ষণার্থীদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুব্রত বিশ্বাস বলেন, নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন তার হাতে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা থাকে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের পাশাপাশি মেয়েদের দক্ষ করে গড়ে তোলার উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি নির্মাণ করতে পারে।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের চাইল্ড সেফটি নেট প্রজেক্ট ম্যানেজার সাগর ডি কস্তা বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য শুধু প্রশিক্ষণ প্রদান করে সনদ বিতরণ করা নয়। প্রশিক্ষণার্থীরা যাতে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে, ইন্টার্নশিপের সুযোগ পায় এবং নিজেদের দক্ষতা প্রয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে—সেই সংযোগ তৈরিই আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের উপজেলা কো—অর্ডিনেটর ছোটন বড়ুয়া বলেন, কক্সবাজার একটি পর্যটননির্ভর অর্থনৈতিক অঞ্চল। এখানে হোটেল, রিসোর্ট ও হসপিটালিটি খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় নারীদের স্থানীয়ভাবেই প্রশিক্ষিত করে স্থানীয় কর্মক্ষেত্রে যুক্ত করা গেলে পরিবারে আয় বাড়বে এবং নারীর আত্মনির্ভরতার পথ সুগম হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কক্সবাজারে পর্যটন মৌসুমে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট ও পর্যটনসেবাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে বাজারচাহিদাভিত্তিক ও ব্যবহারিক দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
হোটেল ম্যানেজমেন্টের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা, কম্পিউটার ও প্রযুক্তি ব্যবহার, গ্রাহকসেবা, পেশাগত আচরণ, নিরাপত্তা এবং কর্মক্ষেত্রের শৃঙ্খলা সম্পর্কে প্রশিক্ষণার্থীদের প্রস্তুত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রশিক্ষণের পর সরাসরি জব ফেয়ারের মাধ্যমে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ কর্মসংস্থান প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করেছে।
বক্তারা বলেন, একটি কিশোরীকে শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে প্রস্তুত করাই যথেষ্ট নয় তাকে এমনভাবে দক্ষ করে তুলতে হবে, যাতে কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা মোকাবিলা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নির্মাণের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। কারণ চাকরি হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু অর্জিত দক্ষতা একজন মানুষকে নতুন সুযোগের সন্ধান দিতে পারে।
তাদের মতে, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিকল্প সৃষ্টি অত্যন্ত জরুরি। যে কিশোরী নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শেখে, দক্ষতা অর্জন করে এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা দেখতে পায়—তার জীবনে অকালবিবাহের চাপ প্রতিরোধের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।
আয়োজকরা মনে করেন, স্থানীয় নারীদের স্থানীয় কর্মবাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করা গেলে একদিকে যেমন পরিবারের আর্থিক ভিত্তি সুদৃঢ় হবে, অন্যদিকে কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পও পাবে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ।
তিন মাস আগে যারা ছিলেন কেবল প্রশিক্ষণার্থী, আজ তারা সম্ভাবনাময় কর্মজীবনের দ্বারপ্রান্তে। হাতে সনদ, অর্জিত দক্ষতায় আত্মবিশ্বাস আর চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন—ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের এ উদ্যোগ তাদের সামনে যে পথ খুলে দিয়েছে, সেটি কেবল চাকরির পথ নয়; এটি আত্মমর্যাদা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও নিজের ভাগ্য নিজ হাতে নির্মাণের পথ। পরে প্রশিক্ষাণার্থীদের হাতে সনদ তুলে দেয়া হয়।