সবুজ ফুসফুস খ্যাত কক্সবাজারের শহরের প্রাণসঞ্চালনী ধমনি বাঁকখালী নদীর কস্তুরাঘাট আজ এক বিষাক্ত ক্যানসারের নীল দংশনে নীলকণ্ঠ হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। নদীর তীর ঘেঁষে মানুষের তৈরি প্রায় ৫০ ফুট উঁচু দুর্গন্ধময় বর্জ্যের পাহাড়টি যেন প্রকৃতির বুকে বিদ্ধ এক জলজ্যান্ত এবং নিষ্ঠুর কুঠারাঘাত করছে। প্রতিদিন টনকে টন অপরিশোধিত কঠিন বর্জ্য ও বিষাক্ত নির্গলিত দ্রব সরাসরি বাঁকখালী নদীতে মিশছে। জোয়ার ভাটায় এই পাহাড়ের পচা তরল বিষাক্ত রক্তধারার মতো মিশে যাচ্ছে নদীর ধমনীতে, যা নিঃশব্দে হত্যা করছে জলজ প্রাণ ও জীববৈচিত্র্যকে। এই অভূতপূর্ব বর্জ্যের পাহাড় থেকে উড়ে যাওয়া বাতাস নদীর আশপাশের বাতাসকে এতটাই ভারী করেছে যে, সেখানে মানুষের নিঃশ্বাস নেওয়া যেন সাক্ষাৎ বিষপানের সমতুল্য।

কক্সবাজার শহরের শত শত বাসা বাড়ির ময়লা আবর্জনার সঙ্গে শহরের অন্তত পাঁচ শতাধিক হোটেল মোটেল ও সরকারি বেসরকারি হাসপাতালের মেডিকেল বর্জ্যও ফেলা হয় এই ময়লার পাহাড়ে। বর্জে্যর স্তূপ থেকে ময়লা আবর্জনা প্রতিনিয়ত নির্গত হয়ে যাচ্ছে বাঁকখালী নদীতে। সেই দূষিত পানি গড়াচ্ছে সমুদ্রে। প্রতিদিনের অপরিকল্পিত ও যত্রতত্র নিক্ষিপ্ত পৌর বর্জ্য এখন এক প্রলয়ঙ্কারী পরিবেশগত মহাবিপর্যয়ের রূপ পরিগ্রহ করেছে। এসব দূষিত পানি মারাত্মক প্রভাব ফেলছে সাগর, পানি ও জীববৈচিতে্র্যর ওপর। এভাবেই সাগরের পানিও দূষিত করছে কক্সবাজার পৌরসভা।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, কক্সবাজারের প্রবেশদ্বার কস্তুরাঘাটের সুউচ্চ বর্জ্য স্তূপ থেকে নির্গত তীব্র বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড ও মিথেন গ্যাস সমগ্র এলাকাকে এক বিষাক্ত শহরে পরিণত করেছে। দুর্গন্ধময় বাতাসে ভাসমান মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া আর জোয়ারের পানিতে মিশে যাওয়া সীসা ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু এলাকার আশেপাশের এলকা জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।
এতে করে শিশুরা ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস, চর্মরোগ ও নানাবিধ পানিবাহিত মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে এক দুঃসহ ও মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। পৌর কতৃপক্ষ এই বিষয়টি দায়িত্বহীন পরিচয় দিচ্ছ্রে এগুলো দ্রুত সরানো না গেলে আগামী দিনগুলো কঠিন সময় অপেক্ষা করছে শহরের মানুষের জন্য।

সচেতন মহলের ক্ষোভ, পৌর কর্তৃপক্ষের দীর্ঘমেয়াদী উদাসীনতা ও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চরম অভাব এই ঐতিহ্যবাহী নদীটিকে এক জীবন্ত ক্যানসারের মতো কুরে কুরে খাচ্ছে। নদী তীরবর্তী এই উন্মুক্ত ডাম্পিং স্টেশনের কারণে মানুষ, নদী আর উপকূলীয় প্রকৃতি তিনই এখন অস্তিত্ব সংকটের এক অভূতপূর্ব চোরাবালিতে নিমজ্জিত। যদি অতি দ্রুত এই বিষাক্ত উৎসের মূলোৎপাটন করা না যায়, অচিরেই পর্যটন নগরীর এই লাইফলাইনটি একটি মৃত নর্দমায় পরিণত হওয়া অনিবার্য।

কস্তুরাঘাট এলাকার আবু হাসান বলেন, পর্যটন রাজধানী হিসাবে শোভাবর্ধনের আড়ালে কস্তুরাঘাটে গড়ে ওঠা বর্জ্যের হিমালয় যেন পৌর প্রশাসনের চরম ব্যর্থতার এক জীবন্ত দলিল। কতৃপক্ষ আইন ও পরিবেশগত বিধিমালার তোয়াক্কা না করে বাঁকখালী নদীর বুক চিরে প্রতিদিন যেভাবে আবর্জনা ফেলা হচ্ছে, তা কোনো সাধারণ অবহেলা নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের শামিল। এসব বর্জ্য না ফেলার জন্য পৌর কতৃপক্ষ কাছে জোর দাবী জানাচ্ছি।
এলাকার গৃহিনী মনোয়ারা বেগম বলেন, রাতে ঘুমাতে পারি না বৃষ্টিতে এত দুর্গন্ধ বর্জ্য। ছেলেমেয়েরা ঘরে বসেও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কতবার পৌরসভায় গেছি, কতবার আবেদন করেছি কাগজই নেওয়া হযয় কাজ কিছুই হয়না। আমরা কি মানুষ না। পৌর কতৃপ্ক্ষ থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নের গালভরা প্রতিশ্রম্নম্নতি দিলেও শহরের কস্তুরাঘাটের বাসিন্দাদের ভাগ্যে জুটেছে কেবলই বিষাক্ত ধোঁয়া আর দুর্গন্ধ দূষিত পানি। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে পৌর কর্তৃপক্ষ এখনও সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলছে।

কক্সবাজারের কস্তুরাঘাটে সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পৌরসভার নির্ধারিত ডাম্পিং স্টেশনের অপর্যাপ্ততা এবং দুর্বল প্রশাসনিক নজরদারির সুযোগে কস্তুরাঘাট দীর্ঘ বছর ধরে গড়ে উঠেছে একটি অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য পাহাড়। গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে শুরু করে হাসপাতালের চিকিৎসা বর্জ্য, প্লাস্টিক, পলিথিন, জৈব আবর্জনা সব একই ভাগাড় পচে বিষে পরিণত হচ্ছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন এখানে ফেলা হচ্ছে শহরের প্রায় ৭০ থেকে ৯০ টন অপরিকল্পিত বর্জ্য।
প্রতিদিন অপরিকল্পিত ডাম্পিংয়ের ফলে সৃষ্ট প্রায় ৫০ ফুট উঁচু এই স্তূপে সাধারণ বর্জ্যের পাশাপাশি মিশছে মারাত্মক মেডিকেল বর্জ্যও। এই বিষাক্ত পানি সরাসরি মিশছে বাঁকখালীর স্রোতে। ফলে নদীর পানি আলকাতরার মতো কালো হয়ে গেছে, ধ্বংস হচ্ছে নদী বিষাক্ত হয়ে উঠছে চারপাশের জনপদ। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগে গত ছয় মাসে ডায়রিযয়া, চর্মরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণজনিত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সরকারি তথ্যে উঠে এসেছে। চিকিৎসকরা এই ঊর্ধ্বগতির সাথে কস্তুরাঘাটের বর্জ্যস্তূপ থেকে নির্গত দূষিত বায়ু ও ভূগর্ভস্থ পানি দূষণের সরাসরি দোষ দিচ্ছেন।

এড: অরুপ বড়–য়া তপু বলেন পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এবং বাংলাদেশ জাতীয় পরিবেশনীতি অনুযায়ী নদীতীরে এ ধরনের অননুমোদিত ডাম্পিং স্পষ্টতই দণ্ডযোগ্য অপরাধ। কিন্তু পৌর কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ অধিদপ্তর উভয়ই দায়িত্ব এড়িয়ে চলছে।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ছাড়া এ ধরনের উন্মুক্ত ডাম্পিং আন্তর্জাতিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সব নীতিমালার পরিপন্থী।

বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন কস্তুরাঘাটে উন্মুক্ত বর্জ্য ফেলা অবিলম্বে বন্ধ করা। আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল স্থাপন। বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিষাক্ত তরল (লিচেট) শোধনের ব্যবস্থা করা। প্লাস্টিক, জৈব ও চিকিৎসা বর্জ্য আলাদা সংগ্রহের ব্যবস্থা। বর্জ্য পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) ও কম্পোস্ট প্ল্যান্ট স্থাপন। নদী দূষণ পর্যবেক্ষণে পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত মনিটরিং এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ।

কক্সবাজার পৌরসভা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আদনান চৌধুরী বলেন, কক্সবাজার শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য গত তিন দশকে কোনো স্থায়ী ও আধুনিক ডাম্পিং স্টেশন বা ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট না থাকায় বর্জ্য আর্বজনা এখানে ফেলা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ চলছে। পরিবেশসম্মত উপায়ে বর্জ্য অপসারণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, এটি কেবল একটি ময়লার ভাগাড় নয়, এটি একটি পরিবেশগত টাইম বোমা। পৌরসভা একদিকে সাধারণ মানুষকে নদী ও নালা নর্দমায় ময়লা না ফেলতে সচেতনতার বাণী শোনায়, অন্যদিকে তারা নিজেরাই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিদিন শত শত টন বর্জ্য নদীর বুকে ঢালছে। অবিলম্বে এই ডাম্পিং সাইট এখান থেকে সরাতে হবে।

কক্সবাজার জেলার বর্তমান সিভিল সার্জন হলেন ডাঃ মোহাম্মদ ছাবের বলেন, কক্সবাজার শহরে অবস্থিত কস্তুরাঘঘাট এলাকায় পচা বর্জ্য থেকে নির্গত গ্যাস এবং দূষিত পানি মানুষের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দীর্ঘমেয়াদে এসব দূষণের ফলে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, চর্মরোগ, এলার্জি, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি বাড়ায়। এসব বর্জ্য খোলা জায়গা রাখা শহরের মানুষদের জন্য খুবই বিপদজনক বলে জানান তিনি।