২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশে। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ। দেশের সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহের পাসের হার সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে বোর্ডটির ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হলেও চারটি প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি।
সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ফলাফলের এসব তথ্য জানানো হয়। বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১ হাজার ৩৪৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মোট ১ লাখ ৫ হাজার ২৮ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬০ হাজার ২৭৪ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ হাজার ৭০০ জন।
মেয়েরা এগিয়ে
এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫—দুই সূচকেই ছেলেদের পেছনে ফেলেছে মেয়েরা। ৫৩ হাজার ৮৭৭ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করেছে ২৮ হাজার ৩৭২ জন; তাদের পাসের হার ৫২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অন্যদিকে ৫১ হাজার ১৫১ জন ছাত্রীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩১ হাজার ৯০২ জন, পাসের হার ৬২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে।
জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও মেয়েদের সাফল্য বেশি। মোট ৫ হাজার ৭০০ জন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর মধ্যে ২ হাজার ৬২১ জন ছাত্র এবং ৩ হাজার ৭৯ জন ছাত্রী।
গত দুই বছরের তুলনায় বড় পতন
ফলাফলের ধারাবাহিকতায়ও ময়মনসিংহ বোর্ডে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৩ সালে এ বোর্ডে পাসের হার ছিল ৮৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৮৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা এক ধাক্কায় কমে ৫৮ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে আসে। এবার আরও কমে হয়েছে ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটিই বোর্ডটির সর্বনিম্ন পাসের হার।
বিভাগভিত্তিক ফলাফলেও পার্থক্য স্পষ্ট। বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৭১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। মানবিক বিভাগে তা ৪৬ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৪৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
চার জেলার মধ্যে পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে নেত্রকোনা—৬০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ময়মনসিংহ জেলায় পাসের হার ৫৭ দশমিক ৮০ শতাংশ, জামালপুরে ৫৫ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং শেরপুরে ৫৫ দশমিক ৪১ শতাংশ।
১০ প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস
ফলাফলের সামগ্রিক চিত্র হতাশাজনক হলেও ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শতভাগ পাসের সাফল্য পেয়েছে। এগুলো হলো—
ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ
ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ
আইডিয়াল মডেল অ্যাকাডেমি
ময়মনসিংহ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল
ফুলবাড়িয়ার ভালুকজান মডেল অ্যাকাডেমি
জামালপুরের ইসলামপুরের উত্তরা গোয়ালের চর আইডিয়াল স্কুল
সরিষাবাড়ীর চিলড্রেনস হোম পাবলিক স্কুল
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ
উপলব্ধ প্রতিবেদনে ময়মনসিংহের প্রথম পাঁচটি, ফুলবাড়িয়ার একটি, জামালপুরের দুটি এবং নেত্রকোনার একটি প্রতিষ্ঠানের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চার প্রতিষ্ঠানে পাস করেনি কেউ
অন্যদিকে চারটি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই এবার এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—
জামালপুরের সরিষাবাড়ীর ছাপরকোনা মনিজা আবুল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়: পরীক্ষার্থী ১১ জন, পাস ০।
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার মুক্তাগাছা কলেজ (স্কুল শাখা): পরীক্ষার্থী ৪ জন, পাস ০।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার শহীদ স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়: পরীক্ষার্থী ৫ জন, পাস ০।
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার কদমতলী কারিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়: পরীক্ষার্থী ৩ জন, পাস ০।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের ফলাফলকে সরাসরি শিক্ষার মান বা শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতার প্রমাণ হিসেবে চিহ্নিত করা সতর্কতার দাবি রাখে। বিশেষ করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম হওয়ায় ফলাফলের ওপর ছোট সংখ্যার প্রভাবও থাকতে পারে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলের পাশাপাশি পরীক্ষার্থী উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক ফল, শিক্ষকসংখ্যা, শ্রেণি কার্যক্রম এবং স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতাও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা
ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মো. এনামুল হক জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কিছুটা কমেছে। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের ফল তুলনামূলক খারাপ হয়েছে। নিয়মিত ক্লাস, পড়াশোনা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মনিটরিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান। প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের ফল উন্নয়নেও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বোর্ড।
সার্বিক ফলাফল বলছে, ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু পরীক্ষার ফল বাড়ানো নয়; বরং নিয়মিত শ্রেণিপাঠ, বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ এবং পিছিয়ে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কার্যকর একাডেমিক সহায়তা নিশ্চিত করা। একদিকে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের কারণগুলো চিহ্নিত করা, অন্যদিকে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যার গভীর মূল্যায়ন—দুই দিকেই নজর দেওয়া জরুরি।