জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার ৯৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইন্টারনেট খরচের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের দাবি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যালয়প্রতি আয়কর ও ভ্যাট বাদে ১০ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়ার পর জুলাই মাসে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সেই অর্থ ফেরত নেওয়া হয়েছে। পরে তা সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জামালপুর কার্যালয়ে অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা।

তবে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জাহানারা খাতুন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, প্রতিটি বিদ্যালয়ের টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা হারুন-অর-রশীদও শিক্ষকদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিশোধ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইসলামপুরের ৯৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইন্টারনেট খরচ বাবদ বিদ্যালয়প্রতি ১২ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। আয়কর ও ভ্যাট বাদ দিয়ে ১০ হাজার ৫০০ টাকা করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের কাছে পৌঁছে। প্রধান শিক্ষকেরা জুন মাসে ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন করেন।

শিক্ষকদের অভিযোগ, জুলাই মাসে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন ক্লাস্টারের সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তারা তাঁদের কাছ থেকে ওই অর্থ ফেরত নেন। এরপর অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

গাইবান্ধা ইউনিয়নের মরাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমুন্নাহার বলেন, জুন মাসে তিনি ১০ হাজার ৫০০ টাকা পেয়েছিলেন। জুলাইয়ে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল হামিদ সরকার রাজস্ব খাতে জমা দেওয়ার কথা বলে তাঁর ক্লাস্টারের বিদ্যালয়গুলোর টাকা ফেরত নেন।

পূর্ব কান্দারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তাঁর বিদ্যালয়ে প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার টাকা ইন্টারনেট খরচ হয়। জুনে ইন্টারনেট খরচের জন্য পাওয়া ১০ হাজার ৫০০ টাকা ১১ জুলাই সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা হারুন-অর-রশীদ ফেরত নেন বলে দাবি করেন তিনি।

বেলগাছা ঘোনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুহুল আমীন এবং ধনতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাইনুল হকও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।

শিক্ষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসলামপুর উপজেলায় মোট ১৭৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৯৬টি বিদ্যালয়ের জন্য ইন্টারনেট খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমানে মাত্র ১৮ থেকে ২০টি বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে বলে কয়েকজন প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংযোগ দিতে দেরি হওয়ায় অনেক শিক্ষক নিজেদের অর্থে ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ইসলামপুর উপজেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমাজের সভাপতি সৈয়দ মাসুদুর রহমান রাজা বলেন, বিদ্যালয়গুলোকে বরাদ্দ দেওয়ার পর তা আবার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ফেরত নেওয়ার বিষয়টি রহস্যজনক। এর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

এদিকে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জাহানারা খাতুনের বিরুদ্ধে অফিস পরিচালনায় স্বেচ্ছাচারিতা, সরকারি বরাদ্দ ব্যবস্থাপনা, প্রেষণ ও পরীক্ষা পরিচালনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন শিক্ষক। এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জাহানারা খাতুন বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা। প্রতিটি বিদ্যালয়ের টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুদকে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ করে কোনো লাভ হবে না।

সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা হারুন-অর-রশীদ বলেন, শিক্ষকদের কাছ থেকে উত্তোলন করা টাকা ইন্টারনেট কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়, জামালপুরের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. কামরুজ্জামান বলেন, শিক্ষকদের অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগের আর্থিক হিসাব

বিদ্যালয়প্রতি ১০ হাজার ৫০০ টাকা হিসেবে ৯৬টি বিদ্যালয়ের জন্য মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ৮ হাজার টাকা। তবে এই অর্থের পুরোটা আত্মসাৎ হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের সিদ্ধান্ত এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি বর্তমানে অভিযোগ ও তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে।

অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে বরাদ্দের সরকারি আদেশ, বিদ্যালয়ভিত্তিক অর্থ ছাড়ের নথি, ব্যাংক উত্তোলনের তথ্য, ফেরত নেওয়া অর্থের রসিদ এবং ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে অর্থ পরিশোধের প্রমাণ যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

দুদকের তদন্তে এসব নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত গন্তব্য ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা স্পষ্ট হতে পারে।