ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা বিক্ষোভে অংশ নেন। উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে চলা আন্দোলনে দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক স্কুল অবরুদ্ধ বা বন্ধ রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থী ইউনিয়নের দাবি, ১ হাজার ৮০০টির বেশি স্কুল এ আন্দোলনের আওতায় এসেছে।
অপর্যাপ্ত শিক্ষক, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন এবং শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন না থাকাসহ বিভিন্ন দাবিতে সেপ্টেম্বর থেকে এ আন্দোলন শুরু হয়। পরে তা প্যারিসের উপকণ্ঠ ছাড়িয়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবার ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে বড় কর্মসূচিগুলোর একটি।
মার্সেই ও নাঁতেসে বিক্ষোভ শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও স্ট্রাসবুর্গ, লিওঁ ও রেনে শহরে একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। অন্যদিকে কিছু এলাকায় বিক্ষোভকারীরা আগুন জ্বালিয়ে এবং বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে প্রতিবাদ জানায়।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, অনেক স্কুলে শ্রেণিকক্ষের অবস্থা নাজুক, শিক্ষক সংকট রয়েছে এবং ভবনগুলো সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কিছু স্কুলে পানি চুইয়ে পড়া ও ইঁদুরের উপদ্রবের মতো সমস্যার কথাও উঠে এসেছে। শিক্ষার্থীরা এসব সমস্যার সমাধানে সরকারের কাছে বাড়তি অর্থ বরাদ্দ ও কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করছেন।
পুলিশি সংঘর্ষে কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন
বিক্ষোভের মধ্যে সোমবার উত্তর ফ্রান্সের লঁস শহরে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর গুরুতর আহত হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় তার হাত ও নিচের বাহুর একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম লা ভয়েক্স দ্যু নর্দ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিশোরটি একটি পুলিশি গ্রেনেড হাতে নেওয়ার পর সেটি বিস্ফোরিত হলে এ ঘটনা ঘটে। তবে ঘটনার সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত মন্তব্য করেনি।
এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, আন্দোলনটি কিছু এলাকায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ থেকে নগর সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
আন্দোলন শুরুর পর থেকে কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ৬ অক্টোবর পর্যন্ত গ্রেপ্তারের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার ১০০; তাদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৮০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা চলছে।
শিক্ষার্থীদের দাবিতে সাড়া সরকারের
আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকুরমু মন্ত্রীদের শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলো নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বিকল্প শিক্ষক দিয়ে পূরণ করা, সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দীর্ঘ স্কুল সময় পুনর্বিবেচনা এবং দুপুরের খাবারের বিরতি বাড়ানোর বিষয় রয়েছে।
এ ছাড়া জরাজীর্ণ স্কুল ভবন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার। মন্ত্রীদের অক্টোবরের শেষ নাগাদ এসব বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাখাতে অর্থায়ন নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৭ সালের বাজেটে শিক্ষা খাতে মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হারে ১ দশমিক ৭ শতাংশ বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ও জরাজীর্ণ অবকাঠামো মোকাবিলায় আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এদিকে, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকার একদিকে শিক্ষার্থীদের দাবি মোকাবিলা করছে, অন্যদিকে দেশের ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি ও ঋণের চাপ সামলানোর চেষ্টা করছে। ফলে শিক্ষা খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
