ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশের ভরা মৌসুম চললেও প্রত্যাশিত পরিমাণ মাছ না পাওয়ায় সংকটে পড়েছেন জেলেরা। বৈরী আবহাওয়া, ঘন ঘন নিম্নচাপ এবং গভীর সাগরে মাছ ধরতে যেতে না পারার কারণে অনেক ট্রলার ঘাটেই পড়ে রয়েছে। অন্যদিকে নদীতেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না মেলায় ধারদেনা, ঋণের কিস্তি এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা।

ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারেও দাম বেড়েছে। মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদীর মোহনায় ডুবোচর জেগে ওঠা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের পরিবর্তনের কারণে ইলিশের বিচরণপথে পরিবর্তন এসেছে, যা চলতি মৌসুমে আহরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ভরা মৌসুমেও জালে মিলছে না প্রত্যাশিত ইলিশ

আষাঢ়-শ্রাবণ মাস সাধারণত ভোলার নদী ও উপকূলীয় এলাকায় ইলিশের প্রধান মৌসুম। এ সময় ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবল স্রোতের বিপরীতে সাগর থেকে ইলিশ নদীর মোহনায় প্রবেশ করে। কিন্তু চলতি মৌসুমে সেই স্বাভাবিক চিত্র দেখা যাচ্ছে না।

নিম্নচাপের কারণে সাগর উত্তাল থাকায় গভীর সমুদ্রে যেতে পারছেন না জেলেরা। আবার যারা মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে জাল ফেলছেন, তাদের অধিকাংশই ফিরছেন খুব অল্প মাছ নিয়ে। ফলে জ্বালানি, বরফ, খাদ্য ও শ্রমিকের খরচও তুলতে পারছেন না অনেক ট্রলার মালিক।

ঋণের বোঝা বাড়ছে জেলেদের

মনপুরার মাছঘাট এলাকার জেলে নবী মাঝি বলেন, গত দুই দশক ধরে তিনি মেঘনায় মাছ ধরছেন। তবে গত কয়েক বছরে ভরা মৌসুমেও আগের মতো ইলিশ মিলছে না। এতে মৌসুম শুরুর আগে নেওয়া ধারদেনা শোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

জনতা বাজার এলাকার প্রবীণ জেলে কামাল মাঝি জানান, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে তিনি এখন ইঞ্জিনচালিত নৌকার পরিবর্তে দাঁড়ের নৌকা ব্যবহার করছেন। কিন্তু তাতেও কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় আয় কমছে, আর দেনা বাড়ছে।

লতাখালী মৎস্যঘাটের জেলে রাকিব মাঝির ভাষ্য, প্রতিদিন নদীতে মাছ ধরতে গেলে জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। কয়েক মাস ধরে এই ব্যয় বেড়েই চলেছে। মৌসুমে ভালো মাছ পেয়ে ঋণ শোধের আশা থাকলেও বাস্তবে মাছ না পাওয়ায় সেই আশা ভেঙে গেছে।

তিনি বলেন, এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে অনেক জেলেকেই এলাকা ছাড়তে হতে পারে।

তালতলা মাঝিঘাটের জেলে শাহ আলম বলেন, নদীতে গিয়ে যে পরিমাণ মাছ মিলছে, তার চেয়ে ব্যয় বেশি হচ্ছে। ফলে প্রতিবার নদীতে নামলেই লোকসান গুনতে হচ্ছে।

মাছ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত

মাঝের মাছঘাটের ব্যবসায়ী আক্তার সিকদার বলেন, আগে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার মাছ কেনাবেচা হতো এবং নিয়মিত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইলিশ পাঠানো যেত। বর্তমানে অনেক দিনই ২ লাখ টাকার মাছও কেনাবেচা হয় না। এতে জেলে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি ব্যবসায়ীরাও বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছেন।

ইলিশ মৌসুমে সাধারণত ভোলার শতাধিক মাছঘাট ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতিতে সরগরম থাকে। তবে এবার অনেক ঘাটেই কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে।

কী বলছে মৎস্য বিভাগ

ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ দেলোয়ার হুসাইন বলেন, মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর প্রায় ১৯০ কিলোমিটার অভয়াশ্রম এলাকায় অসংখ্য ডুবোচর জেগে ওঠায় ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণও ইলিশের প্রাপ্যতায় প্রভাব ফেলছে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, নদীতে পানির প্রবাহ ও গভীরতা বাড়লে আগামী সময়ে ইলিশের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেতে পারে।

উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৩৪ শতাংশ আসে ভোলা জেলা থেকে। চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৭০ জন। তবে এর বাইরে আরও বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত জেলে ইলিশ আহরণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।