জাল ব্যান্ডরোলযুক্ত প্রায় ৭০ হাজার প্যাকেট বিড়ি পাচারের মামলায় ১৪ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল তাঁর। রায় ঘোষণার পর দীর্ঘদিন ছিলেন পলাতক। দুই বছরের বেশি সময় পর আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন জানালেও শেষ রক্ষা হয়নি। আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মেহেরপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর এ এস এম সাইদুর রাজ্জাক কালবেলাকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সাজাপ্রাপ্ত ওই আসামির নাম শাহিন আলম (৩৫)। রোববার (২৫ অক্টোবর) মেহেরপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে শুনানি শেষে বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মেহেরপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট এ এস এম সাইদুর রাজ্জাক।

মামলার এজাহার ও প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (এফআইআর) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই রাতে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর এলাকা থেকে একটি হলুদ রঙের অশোক লেল্যান্ড এক টন পিকআপ ভ্যানে করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিপুল পরিমাণ জাল ব্যান্ডরোলযুক্ত আকিজ ও হাসান বিড়ি মেহেরপুরের বারাদী বাজারের দিকে নেওয়া হচ্ছিল।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই দিন ভোর ৪টা ২০ মিনিটে মেহেরপুর সদর থানার বারাদী পুলিশ ক্যাম্পের তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) দেবাশীষ অধিকারীর নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল বারাদী গ্রামের মসুরীতলা পল্লী বিদ্যুৎ অভিযোগ কেন্দ্রের সামনের সড়কে চেকপোস্ট বসায়। এ সময় সংকেত দিয়ে পিকআপ ভ্যানটি থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। পরে গাড়ি থেকে জাল ব্যান্ডরোলযুক্ত বিড়ি ও পরিবহনসংক্রান্ত চালানের কাগজপত্র জব্দ করে পুলিশ।

জব্দ করা বিড়ির মধ্যে ছিল দুটি প্লাস্টিকের বস্তায় রাখা ৪১ হাজার ৮০০ প্যাকেট জাল ব্যান্ডরোলযুক্ত আকিজ বিড়ি এবং ২৮ হাজার প্যাকেট হাসান বিড়ি। সব মিলিয়ে জব্দ করা হয় ৬৯ হাজার ৮০০ প্যাকেট বিড়ি। এসব বিড়ির আনুমানিক মূল্য ৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া বিড়ি পরিবহনে ব্যবহৃত পিকআপ ভ্যানটির আনুমানিক মূল্য ছিল ১০ লাখ টাকা। বিড়ি ও গাড়িসহ জব্দ করা মালামালের মোট আনুমানিক মূল্য ১৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা।

এ ঘটনায় ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫এ(বি)/২৫(ডি) ধারায় মেহেরপুর সদর থানায় মামলা করা হয়। ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই দায়ের করা মামলাটির নম্বর ২৮ এবং জিআর নম্বর ২৫০/২৪। মামলার বাদী ছিলেন বারাদী পুলিশ ক্যাম্পের এসআই দেবাশীষ অধিকারী। তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন পুলিশের পরিদর্শক জহুরুল ইসলাম।

মামলার এজাহারে আসামি করা হয় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার জয়রামপুর গ্রামের এলাহী বক্সের ছেলে ও পিকআপচালক তহিদুল ইসলাম (৪২), একই উপজেলার মোকলেছুর রহমানের ছেলে আরাফাত রহমান বিশাল (২০) এবং মেহেরপুর সদর উপজেলার জুগিন্দা গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে শাহিন আলমকে (৩৫)। এ ছাড়া কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার হোগলবাড়িয়া গ্রামের কালু মিয়ার ছেলে সাগরসহ অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিনজনকে আসামি করা হয়।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত এজাহারভুক্ত সব আসামিকে ১৪ বছর করে কারাদণ্ড দেন। রায় ঘোষণার দিন আদালতে উপস্থিত থাকায় অপর দুই আসামিকে সেদিনই কারাগারে পাঠানো হয়। তবে শাহিন আলম রায়ের সময় থেকে পলাতক ছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাজা পরোয়ানা জারির পরও অজ্ঞাত কারণে দীর্ঘদিন আদালত থেকে সংশ্লিষ্ট থানায় পরোয়ানাটি পাঠানো হয়নি। এরই মধ্যে গত রোববার আদালতে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণ করেন শাহিন। একই সঙ্গে জামিনের আবেদন জানালে আদালত তা নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় ঘটনাস্থল থেকে আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তাঁদের বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা করা হয়। এরপর শাহিন আলম পলাতক ছিলেন। দীর্ঘ সময় পর আদালতে আত্মসমর্পণ করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে কারাগারে যেতে হয়েছে।

মেহেরপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট এ এস এম সাইদুর রাজ্জাক বলেন, ‘দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত আসামিদের প্রত্যেককে ১৪ বছর করে কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আদালতের রায় কার্যকর করা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব। সাজা পরোয়ানা জারিতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা গাফিলতি হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’