ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী সুরসম্রাট দি আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গনের জমি-সংক্রান্ত বহুল আলোচিত মামলায় আপিল মঞ্জুর করেছেন ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে মামলাটি পুনর্বিচারের জন্য নিম্ন আদালত, অর্থাৎ ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে (Land Survey Tribunal) ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) আলমগীর মুহাম্মদ ফারুকী এ রায় ঘোষণা করেন।
ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী মো. মাছুম রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, উভয় পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে আদালত আপিল গ্রহণ (Allow) করেন এবং পুনর্বিচারের জন্য মামলাটি নিম্ন আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
নিম্ন আদালতের রায় পুনর্বিবেচনার সুযোগ
আদালতের এ আদেশের ফলে নিম্ন আদালতের পূর্ববর্তী একতরফা রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত হয়ে মামলাটি নতুন করে বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাবে। ফলে উভয় পক্ষই তাদের দাবি-দাওয়া, দলিলপত্র ও সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন।
আপিলকারী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ও সরকারি কৌঁসুলি (জিপি) অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম আবিদ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন,
“আদালতের এই রায় সুবিবেচনাপ্রসূত। পুনর্বিচারের মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হব যে, বিরোধীয় জমিতে প্রতিপক্ষের দাবি আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।”
সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সন্তোষ
সুরসম্রাট দি আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গন সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক, সাবেক পিপি ও স্পেশাল পিপি এবং জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শফিকুল ইসলাম বলেন,
“এটি একটি যথার্থ আদেশ। এর মাধ্যমে একতরফা রায় বাতিল হয়েছে এবং ন্যায়বিচারের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও জেলা উদীচীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মো. জামাল বলেন,
“ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ আমাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গৌরবের প্রতীক। এই রায় ঐতিহ্য সংরক্ষণের লড়াইকে শক্তিশালী করবে।”
সঙ্গীতাঙ্গনের সাধারণ সম্পাদক মনজুরুল আলম বলেন, পুনর্বিচারের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য আদালতের সামনে উঠে আসবে বলে তিনি আশাবাদী।
মামলার পটভূমি
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১০ মার্চ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর কথিত উত্তরাধিকার দাবি করে মিজানুর রহমান সঙ্গীতাঙ্গনের প্রায় ৪৯.৫০ শতক জমির মধ্যে ৮ শতক জমির মালিকানা দাবি করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করেন (মামলা নং: এলএসটি-১৪৫/২০২০)।
মামলায় সঙ্গীতাঙ্গনের পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে বিবাদী করা হলেও, পদাধিকারবলে সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে থাকা তৎকালীন জেলা প্রশাসকের নাম উল্লেখ করা হয়নি। একইভাবে পরিচালনা কমিটির নির্বাহী প্রধান, অর্থাৎ সাধারণ সম্পাদককেও বিবাদী করা হয়নি।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৫ মে নিম্ন আদালত একতরফাভাবে বাদীপক্ষের অনুকূলে রায় দেন। রায়ের ভিত্তিতে বিএস রেকর্ড সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
এরপর সঙ্গীতাঙ্গনের তৎকালীন সভাপতি (জেলা প্রশাসক) এবং সাধারণ সম্পাদক পৃথকভাবে আপিল করেন। ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা ওই আপিল (নং-১২৯/২০২৫)-এর ওপর দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত মঙ্গলবার পুনর্বিচারের নির্দেশ দেন।
আইনি তাৎপর্য
আইনজীবীদের মতে, আপিল ট্রাইব্যুনালের এই রায়ের ফলে মামলার মূল বিরোধ এখন পুনরায় নিম্ন আদালতে বিচারাধীন হবে। সেখানে জমির মালিকানা, উত্তরাধিকার এবং রেকর্ড সংশোধনের বিষয়ে উভয় পক্ষের উপস্থাপিত দলিল, সাক্ষ্য ও আইনি যুক্তির ভিত্তিতে নতুন করে রায় দেওয়া হবে।