ভোরের আলো ফোটার আগেই সিলেট নগরীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে জড়ো হতে শুরু করেন শত শত নারী ও পুরুষ দিনমজুর। কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে ঝুড়ি, কেউ আবার খালি হাতেই দাঁড়িয়ে থাকেন। সবার লক্ষ্য একটাই—দিনের জন্য একটি কাজ পাওয়া।

নগরীর বন্দরবাজার, আম্বরখানা, শিবগঞ্জ, উপশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন ভোরে গড়ে ওঠে এই অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার। এখানে বিক্রি হয় না কোনো পণ্য; দর-কষাকষি হয় মানুষের শ্রমের। ঠিকাদার, নির্মাণকাজের মালিক কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এসে প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক বেছে নিয়ে যান।

শ্রমিকদের ভাষায়, প্রতিটি সকাল তাদের কাছে এক নতুন অনিশ্চয়তার শুরু। কাজ মিললে পরিবারের জন্য খাবার, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর সুযোগ তৈরি হয়। আর কাজ না মিললে ফিরতে হয় খালি হাতে।

সিলেটের ভোরের শ্রমবাজার

স্থানীয় শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাজের ধরন ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করে একজন দিনমজুরের দৈনিক মজুরি সাধারণত ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। দক্ষ রাজমিস্ত্রি বা বিশেষায়িত শ্রমিকেরা তুলনামূলক বেশি পারিশ্রমিক পেলেও সাধারণ শ্রমিকদের অনেকেই প্রতিদিন কাজ পান না। বাজার পরিস্থিতি, মৌসুম এবং নির্মাণকাজের চাহিদার ওপরও মজুরি নির্ভর করে।

একজন দিনমজুর বলেন,
“ভোর থেকে দাঁড়িয়ে থাকি। কাজ পেলে পরিবারের জন্য বাজার করতে পারি, না পেলে খালি হাতে ফিরতে হয়। তখন সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে যায়।”

আরেক শ্রমিক বলেন,
“আমরা মানুষ বিক্রি করি না, আমাদের শ্রম বিক্রি করি। কিন্তু প্রতিদিন সেই শ্রমেরও ক্রেতা পাওয়া যায় না।”

বয়সের ভারে ন্যুব্জ এক প্রবীণ শ্রমিকের কণ্ঠে ছিল দীর্ঘশ্বাস। তিনি বলেন,
“বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজও কমে গেছে। কিন্তু সংসারের দায়িত্ব তো কমেনি। তাই প্রতিদিনই এখানে আসতে হয়।”

নেই কোনো সামাজিক নিরাপত্তা

এই শ্রমবাজারে কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই। দুর্ঘটনায় আহত হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণ পান না। অসুস্থ হয়ে পড়লে বন্ধ হয়ে যায় আয়ের একমাত্র উৎস। স্বাস্থ্যবিমা, পেনশন কিংবা সামাজিক সুরক্ষার মতো সুবিধাও তাদের নাগালের বাইরে।

শ্রম অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের নগরায়ণ, নির্মাণখাত ও অবকাঠামো উন্নয়নে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।

সংগ্রামের প্রতিদিনের গল্প

এই শ্রমবাজারে অপেক্ষমাণ প্রতিটি মানুষের পেছনে রয়েছে আলাদা একটি গল্প। কেউ সন্তানের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে চান, কেউ বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা করাতে চান, আবার কেউ কেবল পরিবারের দুই বেলা খাবার নিশ্চিত করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা প্রতিদিন নতুন আশায় ভোরে এসে দাঁড়ান একই জায়গায়। দিনের শেষে কাজ জুটুক বা না-জুটুক, পরদিন আবারও ফিরে আসেন নতুন প্রত্যাশা নিয়ে।

বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

অনেকেই এই শ্রমবাজারকে আবেগের বশে ‘মানুষ বিক্রির হাট’ বলে উল্লেখ করেন। তবে বাস্তবে এখানে বিক্রি হয় না মানুষ; বিক্রি হয় তাদের শ্রম, দক্ষতা এবং একটি দিনের কর্মঘণ্টা। এই অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার বাংলাদেশের নগর অর্থনীতির একটি বাস্তব চিত্র, যেখানে প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভর করে হাজারো পরিবারের জীবিকা।