যে বয়সে শিশুদের হাতে থাকার কথা বই-খাতা, সেই বয়সেই অনেককে দেখা যাচ্ছে হোটেল, ওয়ার্কশপ, মাছের আড়ত, পরিবহন ও বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে দীর্ঘ সময় শ্রম দিতে। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রম উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে স্থানীয় পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। কম মজুরিতে দীর্ঘ সময় কাজ করাতে পারায় অনেক নিয়োগকর্তা শিশুদেরই শ্রমিক হিসেবে বেছে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন বাজার ও কর্মস্থল ঘুরে দেখা যায়, ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী অনেক শিশু প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করছে। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট বয়সের নিচে শিশু নিয়োগ নিষিদ্ধ এবং কিশোর শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রেও কর্মঘণ্টা ও কাজের ধরন সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।
আইন থাকলেও বাস্তবতায় ভিন্ন চিত্র
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী কোনো শিশুকে শ্রমে নিয়োজিত করা যাবে না। সক্ষম কিশোরকে অভিভাবকের অনুমতিতে কাজ দেওয়া গেলেও দিনে নির্ধারিত সময়ের বেশি কাজ করানো আইনসম্মত নয়।
কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, ভালুকার বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁ, ওয়ার্কশপ, বেকারি, মাছের আড়ত, মৎস্য খামার, কাঁচাবাজার এবং কিছু অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের দিয়ে নিয়মিত দীর্ঘ সময় কাজ করানো হচ্ছে।

অল্প বেতনে মিলছে শিশু শ্রমিক।
শিক্ষার বদলে জীবিকার সংগ্রাম
সিডস্টোর বাজারের একটি ডেন্টিং ও পেইন্টিং ওয়ার্কশপে কাজ করছে ১৪ বছর বয়সী চেং মারমা। খাগড়াছড়ি থেকে এসে সে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করলেও শিক্ষানবিশ হওয়ায় এখনো কোনো বেতন পায় না। পরিবারের আর্থিক সংকটই তাকে বিদ্যালয়ের বদলে কর্মস্থলে নিয়ে এসেছে।
একইভাবে ১১ বছর বয়সী সুমন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইঞ্জিনচালিত ভ্যানে ভারী মালামাল পরিবহন করে। প্রতিদিনের আয় থেকে গাড়ির জমা পরিশোধ করে যা থাকে, তা দিয়েই চলে সংসারে সহায়তার চেষ্টা। তবে সুযোগ পেলে আবারও পড়াশোনা করতে চায় সে।

পৌর সদরের একটি রেস্তোরাঁয় কর্মরত ১৩ বছর বয়সী ইমরান জানান, তিনি আগে মাদ্রাসায় পড়তেন। বর্তমানে মাসিক চার হাজার টাকার বিনিময়ে সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কাজ করছেন। একই প্রতিষ্ঠানে ১৪ বছর বয়সী পারভেজ মাসিক নয় হাজার টাকায় থালা-বাসন ধোয়া, ঝাড়ু দেওয়া ও খাবার পরিবেশনসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছে।
আরেক শিশু হাকিম, যার বয়স মাত্র ১৩ বছর, তিন চাকার যানবাহনের হেলপার হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ১২ ঘণ্টা কাজ করে। তার ভাষায়, “পড়তে ইচ্ছা করে, কিন্তু সংসারের অভাবে কাজ করতে হচ্ছে।”
কম বেতনের কারণে শিশুদের প্রতি ঝোঁক
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রেস্তোরাঁ কর্মী জানান, একই কাজের জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিককে যেখানে মাসে ১৮ থেকে ২২ হাজার টাকা দিতে হয়, সেখানে শিশু শ্রমিকদের অনেক কম পারিশ্রমিকে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়। ফলে ব্যবসায়িক লাভের জন্য অনেক মালিক শিশুদের নিয়োগ দিতে আগ্রহী হন।
দারিদ্র্য নয়, সমাধান প্রয়োজন
স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা আসপাডা-র প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আব্দুর রশিদ বলেন, দারিদ্র্যকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে শিশুশ্রমকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রবণতা উদ্বেগজনক।

তিনি বলেন, “একটি শিশুকেও যেন শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে না হয়, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা, শিশুদের শিক্ষা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।”
প্রশাসনের বক্তব্য
ভালুকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফিরোজ হোসেন বলেন, শিশুদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি জানান, প্রশাসন শিশুশ্রম প্রতিরোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে এবং বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।
তার ভাষায়, “পোশাক শিল্পসহ প্রাতিষ্ঠানিক অনেক খাত এখন শিশুশ্রমমুক্ত হলেও আর্থসামাজিক বাস্তবতায় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলোতে এখনো এই সমস্যা রয়ে গেছে। আমাদের লক্ষ্য সব ধরনের শিশুশ্রম ধাপে ধাপে নির্মূল করা।”