“আমার চাওয়া খুবই সামান্য। মরণের আগে যদি একটা ভালো ঘর পেতাম! আর তিনবেলা পেট ভরে খেতে পারতাম! তাহলেই শান্তি পেতাম।” জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু মুছতে মুছতে কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরার শতবর্ষী আছিয়া বেগম।

বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছেন তিনি। একসময় স্বামী-সংসার, সন্তান আর কর্মব্যস্ততায় ভরা ছিল জীবন। বয়সের ভারে শতবর্ষ ছুঁইছুঁই আছিয়া বেগমের এখন একমাত্র সঙ্গী নিঃসঙ্গতা, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তা। সরকারের বয়স্ক ভাতার মাসিক ৬০০ টাকায় কোনোমতে টিকে থাকলেও অনাহার-অর্ধাহারেই কাটছে তার দিন। মাথার ওপর জরাজীর্ণ টিনের ছাউনি, চোখে ঝাপসা দৃষ্টি আর শরীরজুড়ে বার্ধক্যের ব্যথা নিয়ে জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু দুমুঠো খাবার আর একটি নিরাপদ আশ্রয়ের স্বপ্ন দেখছেন।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের নাথপাড়ার এক নির্জন কোণে ছোট্ট একটি ভাঙাচোরা কুঁড়েঘরে বসবাস করেন শতবর্ষী এই নারী। প্রায় দুই দশক আগে স্বামী ময়েজউদ্দিন ঢালীর মৃত্যু হয়। দুই ছেলে নিজেদের অভাব-অনটনের সংসারে মাকে আশ্রয় দিতে পারেননি। দুই মেয়েও স্বামীর সংসারে কষ্টে দিন কাটান। ফলে জীবনের শেষ বয়সে একাই বসবাস করছেন আছিয়া বেগম।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মরিচা ধরা টিনের চাল, ভাঙা বেড়া আর জীর্ণশীর্ণ একটি ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। সামান্য বৃষ্টি হলেই ঘরে পানি পড়ে, ঝড় উঠলে আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটে। ঘরের ভেতরে একটি পুরোনো চৌকি, ছেঁড়া কাঁথা আর কয়েকটি মাটির হাঁড়ি ছাড়া তেমন কিছুই নেই।

কাঁপা কণ্ঠে আছিয়া বেগম বলেন, শরীর আর চলে না বাবা। হাঁটতে গেলে লাঠি লাগে, তবু পা কাঁপে। ভাত রান্না করতেও কষ্ট হয়। তিন মাস পরপর ১ হাজার ৮০০ টাকা ভাতা পাই। এই টাকায় চাল-ডাল কিনি, ওষুধ কিনব কী দিয়ে।
তিনি আরও বলেন, বয়সজনিত নানা রোগে ভুগছেন। উচ্চ রক্তচাপ, বাতের ব্যথা এবং চোখের সমস্যায় কষ্ট পেলেও চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। অনেক সময় খাবারও জোটে না।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আছিয়া বেগমের দুই মেয়ে বিবাহিত এবং তাদের আর্থিক অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। অভাবের সংসারের কারণে তারা মায়ের খোঁজ নিতে পারেন না। বড় ছেলে আলী হোসেন (৬৫) সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন। বড় ছেলে আলী হোসেনের দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে, তবে তারাও আলাদা আলাদা স্থানে বসবাস করেন।

আছিয়া বেগমের ছোট ছেলে ইয়াকুব হোসেন (৫৩) দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। তিনি একটি চায়ের দোকানে কাজ করেন এবং তার স্ত্রী বাসাবাড়িতে কাজ করেন। জানা গেছে, মায়ের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই।
প্রতিবেশী কামরুল ইসলাম বলেন, “চাচি প্রায়ই না খেয়ে থাকেন। আমরা সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার দিয়ে সাহায্য করি। কিন্তু নিয়মিত সহায়তা করা সম্ভব হয় না। বয়সের এই পর্যায়ে তিনি খুবই অসহায় অবস্থায় আছেন।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, গত কালবৈশাখীতে তার ঘরের একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পলিথিন টানিয়ে কোনোমতে বসবাস করছেন। রাতের ঝড়-বৃষ্টিতে ঘর ভেঙে পড়ার ভয় আর সাপ-পোকার আতঙ্কে ঘুমাতে পারেন না তিনি।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, শতবর্ষী এই নারী শুধু একজন ব্যক্তির গল্প নন; তিনি দেশের হাজারো অসহায় প্রবীণের প্রতীক। রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও বাস্তবতায় অনেক প্রবীণ এখনও মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

তাদের মতে, উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে আছিয়া বেগমকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় এনে একটি নিরাপদ ঘর দিতে পারে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও প্রবাসীদের সহযোগিতায় তার খাদ্য ও চিকিৎসার স্থায়ী ব্যবস্থা করা সম্ভব।

একজন শতবর্ষী মা যখন জীবনের শেষ সময়ে অনাহার, অসুস্থতা আর ভাঙা ঘরের আতঙ্ক নিয়ে দিন গোনেন, তখন উন্নয়নের সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি মানবিক দায়িত্বের প্রশ্নটিও সামনে চলে আসে। আছিয়া বেগমের শেষ বয়সের এই দীর্ঘশ্বাস তাই সমাজ ও রাষ্ট্রের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতোই একটি বাস্তবতা।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট অর্ণব দত্ত বলেন, “ধুলিহর ইউনিয়নের বাসিন্দা আছিয়া বেগমের বিষয়টি আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি। তার বয়স প্রায় ১১০ বছরের কাছাকাছি এবং তিনি অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। তার আর্থিক দুরবস্থার বিষয়েও আমরা অবগত হয়েছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারি যেসব সহায়তা খাত রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে যেটি তার জন্য উপযুক্ত হবে, সেই সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি ইতোমধ্যে বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। এছাড়া অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় কীভাবে আরও সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়েও আমরা কাজ করব। যেহেতু তিনি একা থাকেন এবং শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল, তাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহায়তা প্রদানের চেষ্টা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রবীণ ও অসহায় আছিয়া বেগমের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।