কুড়িগ্রামে প্রথমবারের মতো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মাছ চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অটোমেটেড ফিশ ফিডার, এয়ারেটর, সিসিটিভি নজরদারি এবং একোয়াপনিক্স পদ্ধতির ব্যবহার মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি খামারিদের সময়, শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়তা করছে। ফলে জেলার বিভিন্ন এলাকায় নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পরিবারভিত্তিক মাছ চাষেও আগ্রহ বাড়ছে।

সরেজমিনে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বোতলারপাড় এলাকায় দেখা যায়, স্থানীয় মৎস্যচাষি উমর ফারুক তার প্রায় দুই একর আয়তনের পুকুরে অটোমেটেড ফিশ ফিডার মেশিন স্থাপন করেছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস বাংলাদেশ এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহযোগিতায় উপজেলার কয়েকটি পুকুরে এয়ারেটর, অটোমেটেড ফিডার এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

মৎস্যচাষিরা জানান, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে নির্দিষ্ট সময়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাছকে খাবার সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে খাদ্যের অপচয় কমছে, শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পাচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হচ্ছে। বিশেষ করে তীব্র গরমের সময় এয়ারেটর ব্যবহারের মাধ্যমে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হওয়ায় মাছের বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার হার বাড়ছে।

মৎস্যচাষি উমর ফারুক বলেন, “প্রায় ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে স্থাপিত অটোমেটেড ফিডার মেশিনে একসঙ্গে ১২০ কেজি খাবার রাখা যায়। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সময় নির্ধারণ করে দিলে নির্দিষ্ট সময়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাছের খাবার পানিতে পড়ে। বিদ্যুৎ না থাকলেও সৌরশক্তির মাধ্যমে এটি চালানো যায়। ফলে সময়, শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।”

তিনি আরও বলেন, “পুকুরে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করায় নিরাপত্তাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ায়ও মাছের খাবার সরবরাহে আর সমস্যা হয় না।”

এদিকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ির ছাদ ও উঠানে একোয়াপনিক্স পদ্ধতিতে মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষ শুরু হয়েছে। রাজারহাট উপজেলায় কয়েকটি পরিবার অস্থায়ী ট্যাংকে ভিয়েতনাম কই, ট্যাংরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষের পাশাপাশি ছাদে শাকসবজি ও ফলদ গাছের চাষ করছে।

স্থানীয় উদ্যোক্তা অনিতা রাণী বলেন, “আমার বাড়ির ছাদটি আগে অব্যবহৃত ছিল। এখন সেখানে মাছ ও সবজি একসঙ্গে উৎপাদন করছি। এতে পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি আয়ও হচ্ছে। বাড়ির কাজের ফাঁকে সহজেই এসব পরিচর্যা করা যায়।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক পুকুর ব্যবস্থাপনার ফলে মাছ চাষে অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক ও অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানো সম্ভব হচ্ছে। এতে পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকার পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের সুযোগও বাড়ছে।

আরডিআরএস বাংলাদেশের মৎস্য টেকনিক্যাল অফিসার মোজাম্মেল হক বলেন, “দারিদ্র্যপ্রবণ অঞ্চলের মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন উদ্যোক্তা গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা প্রযুক্তিনির্ভর মাছ চাষ সম্প্রসারণে কাজ করছি। একই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ও মাঠ দিবসের আয়োজন করা হচ্ছে।”

রাজারহাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এমদাদুল হক বলেন, “আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বাড়ছে এবং চাষিদের সময় ও খরচ কমছে। এটি ভবিষ্যতে জেলার মৎস্য খাতকে আরও টেকসই ও লাভজনক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর মাছ চাষের এই উদ্যোগ শুধু উৎপাদন বৃদ্ধিই নয়, বরং খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।