দেশের অন্যতম বৃহৎ আম উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁয় চলতি মৌসুমে ফ্রুট ব্যাগের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। নিরাপদ, রপ্তানিযোগ্য ও কীটনাশকমুক্ত আম উৎপাদনের জন্য বহুল ব্যবহৃত এই ব্যাগের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে জেলার হাজারো আমচাষি আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর নওগাঁ জেলায় প্রায় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ২২ হাজার টন। জেলার সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর ও পত্নীতলা উপজেলায় মোট আম উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশ হয়। এসব এলাকায় আম্রপালি, গোপালভোগ, খিরসাপাত, হিমসাগর, বারি-৪, গৌড়মতি ও ব্যানানা ম্যাংগোসহ বিভিন্ন জাতের আম চাষ করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি আমকে পোকার আক্রমণ, দাগ ও রোগবালাই থেকে সুরক্ষা দেয়। এতে কীটনাশকের ব্যবহার কমে এবং ফলের গুণগত মান বৃদ্ধি পায়। ফলে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও এসব আমের চাহিদা বেশি থাকে। ব্যাগিং করা আম সাধারণ আমের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি দামে বিক্রি হয়।

তবে এ বছর পরিস্থিতি ভিন্ন। চাষিদের অভিযোগ, গত বছর যেখানে প্রতিটি ফ্রুট ব্যাগ ৩ টাকা ৭০ থেকে ৩ টাকা ৮০ পয়সায় পাওয়া গেছে, সেখানে এবার একই ব্যাগ কিনতে হয়েছে প্রায় ৬ টাকা ২০ পয়সা দরে। তাও প্রয়োজনীয় পরিমাণে পাওয়া যায়নি।

পোরশা উপজেলার বন্ধুপাড়া গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা রায়হান আলম জানান, তার ২২০ বিঘা জমির আমবাগানের মধ্যে ৬০ বিঘায় প্রায় পাঁচ লাখ আমে ফ্রুট ব্যাগিং করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত ব্যাগ না পাওয়ায় তিনি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত গৌড়মতি জাতের প্রায় সাড়ে চার লাখ আমে ব্যাগিং করতে সক্ষম হয়েছেন।

তিনি বলেন, “ফ্রুট ব্যাগিং করা আমের বাজারমূল্য অনেক বেশি। কিন্তু ব্যাগের সংকটের কারণে এ বছর সম্ভাব্য আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”

একই উপজেলার সাদেরডাঙ্গা গ্রামের আমচাষি বাবুল আক্তার জানান, গত বছর ২০ হাজার আমে ব্যাগিং করে ভালো লাভ করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবার ৫০ হাজার আমে ব্যাগিংয়ের পরিকল্পনা করলেও ব্যাগ সংকটের কারণে মাত্র ১০ হাজার আমে ব্যাগিং করতে পেরেছেন।

সাপাহার উপজেলার বরেন্দ্র এগ্রোর উদ্যোক্তা সোহেল রানা বলেন, “আমার প্রয়োজন ছিল প্রায় তিন লাখ ব্যাগ। কিন্তু সংগ্রহ করতে পেরেছি মাত্র ১৫ হাজার। ফলে বিপুল পরিমাণ আম ব্যাগিংয়ের বাইরে থেকে গেছে, যা উৎপাদনের গুণগত মান ও সম্ভাব্য আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”

চাষিদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন নতুন আমবাগান গড়ে ওঠায় এবং রপ্তানিযোগ্য নিরাপদ আম উৎপাদনে আগ্রহ বৃদ্ধির কারণে ফ্রুট ব্যাগের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। তবে সরবরাহ ব্যবস্থা সেই হারে সম্প্রসারিত না হওয়ায় সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

তারা আরও জানান, সরাসরি রপ্তানির সুযোগ সীমিত থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মধ্যস্বত্বভোগী ও রপ্তানিকারকদের কাছে তুলনামূলক কম দামে আম বিক্রি করতে হয়। রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও সহজ ও কৃষকবান্ধব করা গেলে আমচাষিরা ন্যায্যমূল্য পেতেন এবং জেলার অর্থনীতিও আরও সমৃদ্ধ হতো।

এ বিষয়ে নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোছা. হোমায়রা মণ্ডল বলেন, “উত্তম কৃষি চর্চা (গ্যাপ) অনুসরণ করে নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে কৃষকদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে ফ্রুট ব্যাগের চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। মৌসুমের শেষ দিকে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত ব্যাগ সরবরাহ করতে পারেনি। ভবিষ্যতে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।”

নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে ফ্রুট ব্যাগের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।